রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

‘নো গ্যাস, নো বিল; নো সেবা, নো ট্যাক্স’: রুমিন ফারজানা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম

‘নো গ্যাস, নো বিল; নো সেবা,  নো ট্যাক্স’: রুমিন ফারজানা

ছবি: সংগৃহীত

গ্যাস ও নাগরিক সেবার সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। গ্যাস সরবরাহ না থাকলেও গ্রাহকদের নিয়মিত বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে—এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, নাগরিকরা প্রয়োজনীয় সেবা না পেলে তাদের কাছ থেকে কর আদায়ের যৌক্তিকতা কতটা। শনিবার ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, গ্যাস না থাকলে বিল নয়, সেবা না মিললে কর নয়।

রুমিন ফারহানার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশের চলমান জ্বালানি সংকট এবং নাগরিক সেবার মান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় গ্যাসের চাপ কম থাকা কিংবা একেবারেই সরবরাহ না থাকার অভিযোগের মধ্যে তার এই মন্তব্য সামনে এসেছে।

এর আগে জাতীয় সংসদেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সরব ছিলেন এই সংসদ সদস্য। গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে, অনেক এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ স্বাভাবিক নয়। কখন সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে আর কখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

রুমিন ফারহানা সংসদে বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। সরবরাহের অনিয়মের কারণে রান্নাবান্না থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানার কার্যক্রমেও নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার বিষয়েও তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

তার বক্তব্যে সরকারের ঘোষিত অগ্রাধিকারের বিষয়টিও উঠে আসে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি খাতে নিশ্চয়তার কথা বলা হলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষ এসব ক্ষেত্রে কতটা স্বস্তি পাচ্ছে।

জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও সমালোচনা করেন তিনি। রুমিন ফারহানার দাবি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে বহু মানুষ চাকরি হারিয়েছেন এবং বিভিন্ন শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। তার মতে, একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য নাগরিক সেবা নিয়ে মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।

গ্যাস সংকট নিয়ে নিজের নির্বাচনী এলাকাতেও এর আগে কথা বলেছেন রুমিন ফারহানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস উৎপাদনকারী অঞ্চল হলেও সেখানকার মানুষ পর্যাপ্ত গ্যাস সুবিধা পাচ্ছেন না—এমন অভিযোগ তিনি বিভিন্ন সময়ে তুলে ধরেছেন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত গ্যাস দেশের অন্য অঞ্চলের শিল্প ও আবাসিক কাজে ব্যবহৃত হলেও উৎপাদন এলাকার বাসিন্দাদেরই যদি সরবরাহ সংকটে থাকতে হয়, তাহলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে বলে তিনি মত দিয়েছেন।

এদিকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়া ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে রাজধানীর কিছু এলাকায় দিনের বড় একটি সময় গ্যাস না থাকার অভিযোগ করছেন বাসিন্দারা। এতে রান্নাবান্নার কাজে ব্যাপক অসুবিধা হচ্ছে। অনেক পরিবারকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা তাদের মাসিক ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সংসদেও সম্প্রতি এ ধরনের অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদিন ৩ সেপ্টেম্বর সংসদে অভিযোগ করেন, শ্যামপুর, পোস্তগোলা ও যাত্রাবাড়ী এলাকার বিপুলসংখ্যক পরিবার গ্যাস সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তার দাবি, ওইসব এলাকার প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না। অথচ অনেক গ্রাহককে নিয়মিত গ্যাসের বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতেই রুমিন ফারহানার ‘গ্যাস না থাকলে বিল নয়’ মন্তব্যটি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। কারণ গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে গ্রাহকের বিল পরিশোধের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভোক্তাদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। কোনো এলাকায় দীর্ঘ সময় সরবরাহ বন্ধ থাকলে কিংবা প্রয়োজনীয় চাপ না থাকলে গ্রাহকরা কেন একই হারে বিল দেবেন—এমন প্রশ্ন বিভিন্ন সময়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে গ্রাহক ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জবাবদিহি থাকা জরুরি। একটি নির্দিষ্ট সেবার জন্য নিয়মিত অর্থ নেওয়া হলে সেই সেবার মান ও ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, অবৈধভাবে বিল বন্ধ করে দেওয়া বা নিজস্ব সিদ্ধান্তে অর্থ পরিশোধ না করার পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো এবং নির্ধারিত আইন ও বিধির আওতায় সমাধান চাওয়াই গ্রাহকদের জন্য নিরাপদ পথ।

গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিল্পকারখানায় পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। কারখানার যন্ত্রপাতি নির্ধারিত সক্ষমতায় পরিচালনা করা সম্ভব না হলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম এবং কর্মসংস্থানের ওপরও পড়তে পারে।

ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাসের চাপ কম থাকলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পণ্যের বাজারমূল্যেও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে জ্বালানি সংকটের সঙ্গে দ্রব্যমূল্য ও কর্মসংস্থানের সম্পর্কও রয়েছে।

রুমিন ফারহানার বক্তব্যে তাই শুধু আবাসিক গ্যাস সরবরাহের বিষয় নয়, সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও সামনে এসেছে। নাগরিকরা নিয়মিত বিল ও কর পরিশোধ করলেও বিনিময়ে তারা পর্যাপ্ত ও মানসম্মত সেবা পাচ্ছেন কি না, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের—এমন বার্তাই তার বক্তব্যে উঠে এসেছে।

এদিকে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। গ্যাসের উৎপাদন, আমদানি, বিতরণ ও ব্যবহার—সব পর্যায়ে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা না থাকলে সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়িয়েও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান পাওয়া কঠিন। একই সঙ্গে কোথায় কী পরিমাণ চাহিদা রয়েছে এবং কোন এলাকায় সরবরাহ ঘাটতি বেশি, তার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, গ্যাস ও বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবাগুলো নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী করা হবে। বিশেষ করে আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার কাজে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। দীর্ঘ সময় গ্যাস না থাকলে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও ব্যাপক ভোগান্তি তৈরি হয়।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। সংসদ সদস্যদের বক্তব্যে জ্বালানি সংকটের পাশাপাশি নাগরিক সেবা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে সরকারের জবাবদিহির দাবি জোরালো হচ্ছে। রুমিন ফারহানার সর্বশেষ মন্তব্য সেই ধারাবাহিক আলোচনাকেই আরও সামনে নিয়ে এসেছে।

সব মিলিয়ে, গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি এবং এর বিপরীতে নিয়মিত বিল আদায়ের বিষয়টি এখন গ্রাহক অধিকার ও সরকারি সেবার মানের আলোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। রুমিন ফারহানার বক্তব্যকে ঘিরে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো—নাগরিকরা যদি নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করেন, তাহলে তার বিপরীতে কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? এই প্রশ্নের কার্যকর ও স্বচ্ছ সমাধানই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!