রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

যেভাবে আপোসহীন নেত্রী হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়া

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫, ০৬:১৪ পিএম

যেভাবে আপোসহীন নেত্রী হয়ে ওঠেন খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়া—একটি নাম, একটি সংগ্রামের প্রতীক। সাধারণ গৃহবধূ থেকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হয়ে ওঠার এই পথচলা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। আপোষহীন মনোভাব ও দৃঢ় নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি বারবার মানুষকে অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে সাহস জুগিয়েছেন। রাষ্ট্রের সংকটকালে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অপ্রতিরোধ্য নেতৃত্ব।

শুধু স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধেই নয়, পরবর্তী সময়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনের অন্ধকার ছায়া থেকে দেশকে মুক্ত রাখার সংগ্রামেও তার ভূমিকা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এই জনপ্রিয় নেত্রী ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার মা চন্দনবাড়ির সন্তান তৈয়বা মজুমদার এবং বাবা ফেনীর ফুলগাজির ইস্কান্দার মজুমদার।

দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়নকালে তৎকালীন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। এই দম্পতির দুই সন্তান—বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মরহুম আরাফাত রহমান কোকো।

১৯৮১ সালের ৩০ মে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বিপথগামী কিছু সেনা সদস্যের হাতে শাহাদাত বরণ করেন। তার আগ পর্যন্ত খালেদা জিয়া ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের ভেতরে বিভক্তি দেখা দেয়। তখন দ্রুতই ৭৮ বছর বয়সী বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়। খালেদা জিয়াকে ঘিরে সামরিক ও শাসকগোষ্ঠীর এক ধরনের ভয় কাজ করছিল, যে কারণে তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ সাত্তারকে রাষ্ট্রপতি রাখতে আগ্রহী ছিলেন। এতে বিএনপির ভেতরে মতবিরোধও তৈরি হয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বয়স ও দল পরিচালনা নিয়ে সাত্তারের প্রতি অসন্তোষ বাড়তে থাকে। এমন প্রেক্ষাপটে দলের একাংশ খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আনার উদ্যোগ নেয়। যদিও তখনও রাজনীতির প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না। তবে নেতাকর্মীদের অনুরোধ ও চাপের মুখে তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ নিয়ে এরশাদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়। কারণ তিনি তখন ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনায় ছিলেন এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে রাজপথ উত্তাল হয়ে উঠতে পারে—এই আশঙ্কা তার মধ্যে ছিল।

সব বাধা অতিক্রম করে ১৯৮২ সালের ১৩ জানুয়ারি তিনি একজন কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে যুক্ত হন। একই বছরের ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানের সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদনকালে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া।

দলের তরুণ অংশ তাকে বিএনপির প্রধান হিসেবে দেখতে চাইলেও এরশাদের পছন্দ ছিল আব্দুস সাত্তার। চেয়ারম্যান পদে একই সঙ্গে প্রার্থী হওয়ায় দল অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে। পরে সাত্তারের অনুরোধে খালেদা জিয়া সহ-সভাপতি বা ভাইস-প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাবও গ্রহণ করেননি। শেষ পর্যন্ত তিনি চেয়ারম্যান পদ থেকে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।

১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। এরপর বিএনপির ভেতরে খালেদা জিয়ার প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৮৩ সালের মার্চে তিনি সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন। ১৯৮৪ সালের ১০ মে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দেশজুড়ে তার পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলনেই তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। রাজনীতিতে আসার মাত্র এক দশকের মধ্যেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী দায়িত্বে পৌঁছান তিনি।

তিনি তিন দফায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন—১৯৯১ থেকে ১৯৯৬, ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বল্প সময় এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত।

২০০৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি ক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এরপর আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগতভাবে নির্যাতনের শিকার হতে হয়। ২০১০ সালে সেনানিবাসের বাসা থেকে এক কাপড়ে বের করে দেওয়ার ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।

পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেওয়া হয়। বিচার বিভাগকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে তাকে দণ্ডিত করা হয়, যার ফলে ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি অংশ নিতে পারেননি। কারাবন্দি অবস্থায় পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেয়ে তার শারীরিক অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের বিদেশে চিকিৎসার পরামর্শ থাকলেও তা অনুমোদন দেওয়া হয়নি। পরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময় ২০২০ সালের ২৫ মার্চ শর্তসাপেক্ষে তাকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং গুলশানের বাসভবনে রাখা হয়।

বিএনপির অভিযোগ, আপোষের শর্তে বিদেশে চিকিৎসার প্রস্তাব দেওয়া হলেও গণতন্ত্রের প্রশ্নে খালেদা জিয়া কখনোই আপস করেননি।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে যে গণআন্দোলন শুরু হয়, তা শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের রূপ নেয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন এবং পরদিন ৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতির আদেশে খালেদা জিয়া মুক্তি পান।

মুক্তির পর লন্ডনে চিকিৎসা নিলেও বয়স ও দীর্ঘদিনের শারীরিক ধকল তাকে দুর্বল করে তোলে। গত ২৩ নভেম্বর রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। প্রায় এক মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর মঙ্গলবার সকাল ৬টায় তিনি সেখানে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!