সৈয়দ আবুল হাসনাত জিসান
প্রকাশিত: মার্চ ১৬, ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম
প্রতীকী ছবি
ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা ঘিরে মানুষের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়ের একটি বিশেষ সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এই আনন্দঘন সময়ে নতুন পোশাক, পারিবারিক মিলনমেলা কিংবা মিষ্টান্নের পাশাপাশি একে অপরকে শুভেচ্ছা জানানোও উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
একসময় এই শুভেচ্ছা জানানোর অন্যতম মাধ্যম ছিল রঙিন কাগজের ঈদ কার্ড। ঈদের কয়েকদিন আগে থেকেই বইয়ের দোকান কিংবা লেখাপড়ার সামগ্রীর দোকানে দেখা যেত বিভিন্ন নকশা ও রঙের কার্ডের সমাহার। মানুষ সেখান থেকে পছন্দ করে কিনে নিত প্রিয়জন, বন্ধু বা দূরে থাকা আত্মীয়দের জন্য একটি করে কার্ড।
ছোট্ট সেই কার্ডের ভাঁজে লুকিয়ে থাকত ভালোবাসা, বন্ধুত্ব আর আন্তরিকতার বার্তা। অনেকেই কার্ডের ভেতরে নিজের হাতে কয়েকটি লাইন লিখে দিতেন—কখনো কবিতার পঙ্ক্তি, কখনো স্নেহভরা শুভেচ্ছা। এরপর খামে ভরে নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাঠানো হতো ডাকযোগে। প্রাপকের হাতে পৌঁছালে একটি ছোট্ট কার্ডই হয়ে উঠত আনন্দের বিশেষ উপলক্ষ।
ঈদ কার্ড কেবল একটি কাগজের টুকরো ছিল না; এটি ছিল সম্পর্কের স্মৃতি ধরে রাখার এক আবেগময় নিদর্শন। অনেকেই এসব কার্ড যত্ন করে রেখে দিতেন ডায়েরির পাতায়, বইয়ের ভাঁজে কিংবা আলমারির কোনো গোপন স্থানে। বহু বছর পর সেসব কার্ড হাতে পেলে মনে পড়ত প্রিয় মানুষগুলোর কথা, ফিরে আসত পুরোনো দিনের আবেগ।
তবে প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের যোগাযোগের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন আর ডাকযোগে কার্ড পাঠানোর জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। মোবাইল ফোনের একটি স্পর্শেই মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায় ঈদের শুভেচ্ছা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বার্তা আদান–প্রদানের বিভিন্ন মাধ্যমে ছবি, ভিডিও কিংবা নান্দনিক নকশার মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানোর নতুন নতুন উপায় তৈরি হয়েছে।
এর ফলে কাগজের ঈদ কার্ডের ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। যদিও কিছু প্রতিষ্ঠান বা দপ্তরে সীমিত পরিসরে এখনো কার্ড বিনিময়ের প্রচলন দেখা যায়। পাশাপাশি কিছু তরুণ-তরুণী নস্টালজিয়ার টানে বা সৃজনশীল আগ্রহ থেকে মাঝে মাঝে ঈদ কার্ডের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে।
প্রযুক্তির এই দ্রুতগতির যুগে ডিজিটাল শুভেচ্ছা যোগাযোগকে সহজ ও তাৎক্ষণিক করেছে। তবে হাতে লেখা একটি কার্ডের যে আবেগ, অপেক্ষা ও স্পর্শের উষ্ণতা—তার অনুভূতি অনেক সময় ডিজিটাল বার্তায় পুরোপুরি পাওয়া যায় না।
সময়ের পরিবর্তনে তাই ঈদ কার্ডের সেই বিশেষ আনন্দ এখন অনেকটাই স্মৃতির অংশ হয়ে গেছে। তবুও পুরোনো কোনো বইয়ের ভাঁজে কিংবা ডায়েরির পাতায় হঠাৎ যদি পাওয়া যায় একটি ঈদ কার্ড, তখনই যেন ফিরে আসে সেই সময়ের আবেশ—যখন একটি ছোট্ট কার্ডই মানুষের হৃদয়ে ঈদের আনন্দকে আরও গভীর করে তুলত।
শেষ পর্যন্ত ঈদের শুভেচ্ছা কাগজের কার্ডে লেখা হোক কিংবা মোবাইলের পর্দায় ভেসে উঠুক—তার প্রকৃত ঠিকানা মানুষের হৃদয়েই।
মাতৃভূমির খবর