মীর শাকিল
প্রকাশিত: মে ২১, ২০২৬, ০৯:১১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
২০২৫ সালের ৫ মার্চ, মাগুরা শহরতলীর নিজনান্দুয়ালী গ্রামে বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসে দিবাগত রাতে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার শিকার হয় ৮ বছরের শিশু আছিয়া। শিশুটির বড় বোনের স্বামী ও শ্বশুর তাকে ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা করেন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৩ মার্চ রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শিশুটি মারা যায়। এ ঘটনায় শিশুর মা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন ৮ মার্চ।
বিচারে প্রধান আসামি হিটু শেখের ফাঁসির রায় হয়েছে সেও এক বছর হয়েছে। আদালতে দোষ স্বীকারের এক বছর পার হলেও সেই আসামির মৃত্যুদন্ড এখনো কার্যকর করতে পারেনি বিচার বিভাগ।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড। খেলতে যাচ্ছি' বলে বের হয়েছিল শিশু ইরা। চকলেট কিনে দেওয়া ও বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ইরাকে বাড়ি থেকে বের করে আনে বাবু শেখ, নিয়ে যায় গহীন জঙ্গলে। এরপর প্রথমে শিশু ইরাকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। শিশুটি চিৎকার করলে ও বাবাকে বলে দেবে বলে জানালে বাবু শেখ তার মুখ চেপে ধরে। এরপর গলা কেটে সেখানেই রেখে চলে আসে। রক্তাক্ত শরীর নিয়ে সে তখনো বেঁচে ছিল, লড়াই করছিল। শেষ পর্যন্ত সোমবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে তার মৃত্যু হয়। পরে পুলিশ তাকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলের ওই স্থানে গিয়ে শিশুটির রক্তমাখা সালোয়ার উদ্ধার করে। চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন, ইরা ও ধর্ষণের শিকার হয়েছিল।
বিচারে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামি বাবু শেখ ওরফে মাহবুব আলম আদালতে দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন এবং বর্তমানে তিনি কারাগারে বন্দি আছেন। আদালতে দোষ স্বীকারের ৩ মাস চলমান তবে এখনো মামলার তদন্ত চলমান।
ইরার মৃত্যুর শোক পুরোপুরি না কাটতেই ভয়াবহ হত্যাকান্ডে ফের কেপে ওঠে দেশ।
২০২৬ সালের ১৯ মে সকাল, রাজধানীর পল্লবী। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা প্রতিদিনের মতো বাসা থেকে বের হয়েছিল বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই সকালটাই হয়ে ওঠে তার জীবনের শেষ সকাল। পাশের ফ্ল্যাটের এক ব্যক্তি কৌশলে তাকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। এরপর ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাকে। ঘটনাটির নিষ্ঠুরতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে যায়। একই দিন দুপুরে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সন্ধ্যার মধ্যে প্রধান আসামি সোহেল রানা গ্রেপ্তার হয়। পরে আদালতে সে দোষ স্বীকারও করে।
এ ঘটনায় এক সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দিয়েছে আইনমন্ত্রী। তবে রামিসার বাবা বিচার চান না, আস্থা নেই তার এই বিচপার ব্যাবস্থায়। শঙ্কা এটাও আছিয়া হত্যার মত সময়ের সাথে সাথে নতুন কোন ঘটনার মধ্যে দিয়ে চাপা পরে যাবে।
তিনটি ঘটনা-তিনটি সময়, তিনটি স্থান। কিন্তু একটি অভিন্ন সত্য, শিশুরা নিরাপদ নয়।এই ধারাবাহিকতা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি একটি বড় সংকেত-আমাদের সমাজ, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আমাদের বিচার প্রক্রিয়ার কোথাও না কোথাও গভীর সমস্যা আছে।
আজ আছিয়া নেই, ইরা নেই, রামিসাও নেই। তাদের হাসি থেমে গেছে, স্বপ্ন ভেঙে গেছে। কিন্তু তাদের গল্প থেমে নেই। প্রতিটি ঘটনা আমাদের সামনে একটাই প্রশ্ন তুলে ধরছে—আর কত?
আর কত আছিয়া, ইরা, রামিসার নাম আমাদের শুনতে হবে? আর কত মায়ের কান্না আমাদের বিবেককে নাড়া দেবে?
এখন সময় নীরবতা ভাঙার। এখন সময় জবাবদিহি নিশ্চিত করার। এখন সময় এমন একটি সমাজ গড়ে তোলার—যেখানে কোনো আছিয়া, ইরা বা রামিসার নাম আর কখনো এভাবে উচ্চারণ করতে না হয়।
মাতৃভূমির খবর