প্রকাশিত: মে ১৫, ২০২৬, ০৪:২৩ পিএম
দেশে ক্রমশ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হামজনিত নিউমোনিয়ার প্রকোপ। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম এমন মানুষের মধ্যে এই রোগ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট, জ্বর, কাশি ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা—সচেতনতা, সময়মতো টিকা এবং দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত না করা গেলে এটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে “হামজনিত নিউমোনিয়া: বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও করণীয়” শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন ও দ্য চেস্ট অ্যান্ড হার্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ। শুক্রবার (১৫ মে) সকাল ১১টায় রাজধানীর মিন্টো রোডস্থ শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হবে এ সম্মেলন।
নীরবে বাড়ছে ঝুঁকি:
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের সংক্রমণকে অনেকেই এখনও সাধারণ ভাইরাসজনিত অসুখ হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—হাম থেকে সৃষ্ট নিউমোনিয়া শিশু মৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত অপুষ্ট শিশু, টিকা না নেওয়া শিশু, বস্তিবাসী ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, হামের পর শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ফুসফুসে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং নিউমোনিয়া তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগীকে আইসিইউ পর্যন্ত নিতে হচ্ছে। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে গত কয়েক মাসে শিশুদের নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এটি শুধু একটি রোগ নয়, এটি সামাজিক সংকট:
বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামজনিত নিউমোনিয়া শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি এখন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটেও পরিণত হচ্ছে। একটি শিশুর দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা পুরো পরিবারকে মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। গ্রামের অনেক পরিবার চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে ঋণগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক অভিভাবক এখনও টিকার বিষয়ে বিভ্রান্তি ও গুজবের কারণে শিশুদের টিকাদান সম্পন্ন করছেন না। ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগ হয়েও হাম আবারও ভয়ংকরভাবে ফিরে আসছে।
রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্বেগ:
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে ভাইরাসজনিত সংক্রমণ বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দূষিত বায়ু, ঘনবসতি, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুদূষণ ও ধুলাবালির কারণে ফুসফুস দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা হামের পর নিউমোনিয়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শিশু হাসপাতাল ও বক্ষব্যাধি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগ শনাক্তে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে।
সংবাদ সম্মেলনে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব পেয়েছে:
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, মূলত— হামজনিত নিউমোনিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি, শিশু ও বয়স্কদের ঝুঁকি, টিকাদানের গুরুত্ব, হাসপাতালের প্রস্তুতি ও চিকিৎসা সংকট, সচেতনতা বৃদ্ধি, জাতীয় পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি, বায়ুদূষণ ও ফুসফুসের স্বাস্থ্যঝুঁকি, জরুরি করণীয় ও নীতিগত সুপারিশ—
এসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
জনসচেতনতার বিকল্প নেই:
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “হাম প্রতিরোধে টিকাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।” পাশাপাশি আক্রান্ত রোগীকে আলাদা রাখা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এবং দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।
তারা আরও বলেন, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরের বস্তি—সবখানে স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় নেতাদেরও এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে হবে।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দাবি:
স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীরা বলছেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে শিশুস্বাস্থ্য বড় ঝুঁকিতে পড়বে। তারা জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, সরকারি হাসপাতালে শিশু ও বক্ষব্যাধি ইউনিট বাড়ানো এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার দাবি জানিয়েছেন।
একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকের ভাষায়, “একটি শিশুর কষ্ট মানে পুরো জাতির ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়া। হামজনিত নিউমোনিয়াকে অবহেলা করার সুযোগ নেই।”
মানবিক সংকটের মুখে সমাজ:
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে যদি শিশুর মৃত্যু হয়, তবে সেটি শুধু পরিবারের নয়—রাষ্ট্রেরও ব্যর্থতা।
তাই এখনই প্রয়োজন সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ।
কারণ, একটি টিকা যেমন বাঁচাতে পারে একটি শিশুর জীবন, তেমনি একটি সচেতন সিদ্ধান্ত বাঁচাতে পারে পুরো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে।



