রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

লালমাটিয়ার শাহী মসজিদ: ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: এপ্রিল ১৭, ২০২৬, ০৩:২১ পিএম

লালমাটিয়ার শাহী মসজিদ: ইতিহাস, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন

ছবিঃ সংগৃহীত

বাংলাদেশের স্থাপত্য ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দেশের বিভিন্ন প্রাচীন মসজিদ। সেই ধারাবাহিকতায় রাজধানী ঢাকার মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় অবস্থিত শাহী মসজিদ—যা “বিবি মসজিদ” নামেও পরিচিত—ইতিহাস, ধর্মীয় চর্চা ও স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে আজও মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে চলেছে।

ইতিহাস সূত্রে জানা যায়, ১৬৬৫ সালে তৎকালীন বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁ এই মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন বলে ধারণা করা হয়। “বিবি মসজিদ” নামকরণের পেছনে একটি জনশ্রুতি রয়েছে—মসজিদের এক পাশে দারা বিবি নামে এক সম্ভ্রান্ত নারীর অদৃশ্য সমাধি রয়েছে বলে মনে করা হয়। এ বিষয়টি বিশিষ্ট গবেষক ড. আহমাদ হাসান দানীর লেখাতেও উল্লেখ পাওয়া যায়।

বর্তমানে মসজিদটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে একটি বৃহৎ ইসলামিক কমপ্লেক্স, যার মধ্যে রয়েছে সুবিশাল পুকুর, ঈদগাহ মাঠ এবং জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া মাদ্রাসা। প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই কমপ্লেক্সটি শুধু একটি উপাসনালয় নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় শিক্ষা ও সামাজিক কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।

স্থাপত্যের দিক থেকে মসজিদটি বেশ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। চুন-সুরকির নির্মাণশৈলী, মাটির গভীরে প্রোথিত ভিত্তি, পুরু ইটের দেয়াল এবং গম্বুজাকৃতির ছাদ এটিকে একটি মুঘল স্থাপত্যের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে। মসজিদের মেহরাবে পার্সিয়ান ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার এবং ছাদের চারপাশে স্থাপিত মিনারগুলো এর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

মসজিদ কমপ্লেক্সে প্রবেশের জন্য রয়েছে তিনটি প্রধান গেট, যা স্থানীয়ভাবে ১ নম্বর, ২ নম্বর এবং ৩ নম্বর গেট নামে পরিচিত। এই তিন দিক দিয়ে প্রবেশ করা যায়; অপরদিকে রয়েছে একটি বৃহৎ পুকুর, যা পরিবেশকে আরও মনোরম করে তুলেছে।

কালের পরিক্রমায় মসজিদটির মূল কাঠামোর কিছু অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও পরবর্তীতে ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে এর বর্তমান রূপ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল।

ব্রিটিশ উপনিবেশিক আমলে এলাকার জনশূন্যতা ও অবহেলার কারণে মসজিদটি দীর্ঘদিন ব্যবহারের বাইরে ছিল। ১৯৪৭ সালের পর এলাকাটিতে পুনরায় বসতি গড়ে উঠলে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মসজিদটি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেন।

এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মাওলানা আব্দুর রউফ (রহ.)। তিনি এলাকাবাসীর সহায়তায় জঙ্গলাকীর্ণ ও পরিত্যক্ত মসজিদটি পরিষ্কার করে পুনরায় নামাজের উপযোগী করে তোলেন। পরবর্তীতে তাঁর উদ্যোগেই এখানে মক্তব ও হিফজ বিভাগ চালু হয়, যা ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ মাদ্রাসায় রূপ নেয়। আজ এটি “জামিয়া ইসলামিয়া লালমাটিয়া” নামে সুপরিচিত।

বর্তমান খতিবদের মতে, মসজিদ ও মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় শিক্ষা, কোরআন তাফসির, নিয়মিত নামাজ এবং বিভিন্ন ইসলামিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যা এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বিশ্লেষকদের মতে, লালমাটিয়ার শাহী মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়—এটি ঢাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এর প্রাচীন কাঠামো সংরক্ষণ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: মোঃ মামুনুর রহমান

ডিরেক্টর, দৈনিক মাতৃভূমির খবর

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!