প্রকাশিত: মে ২৯, ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম
দেশজুড়ে উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হাম। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় সব বিভাগেই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৭৪ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। একই সময়ে মারা গেছেন আরও ৯ জন। এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৮ হাজার ৫৭৯ জনে এবং মোট সন্দেহজনক মৃত্যু হয়েছে ৪৮৫ জনের।
অন্যদিকে পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৮ হাজার ৯৪৩ জনে। নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ৯০। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, গত তিন মাসে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে নতুন শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ও হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের হাসপাতালগুলোতে হাম আক্রান্ত শিশুদের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৫৪ হাজার ৭৯৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন ৫১ হাজার ৫১১ জন।
ঢাকায় সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি
দেশের আট বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু ঢাকা বিভাগেই নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৩৩৫ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৭ জনের। এখন পর্যন্ত বিভাগটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৩২ হাজার ৪০৭ এবং মৃত্যু ১৯৬ জন। নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৬ হাজার ২১৬ জন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সচেতনতা, শিশুদের টিকা না নেয়া এবং শহরমুখী জনসংখ্যার চাপ ঢাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করেছে।
চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত ১১ হাজার ৯৫ জন, বরিশালে ৬ হাজার ৮৯ জন, রাজশাহীতে ৬ হাজার ২৪৭ জন এবং খুলনায় ৫ হাজার ১০৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। সিলেট বিভাগেও বাড়ছে উদ্বেগ, যেখানে মোট আক্রান্ত ৩ হাজার ৪৩২ জন।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে শিশুরা
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম মূলত শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং যারা টিকা নেয়নি—তাদের মধ্যে জটিলতা দ্রুত বাড়ছে।
হামের কারণে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট, চোখের সংক্রমণ, এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহ পর্যন্ত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগী সুস্থ হলেও দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা থেকে যাচ্ছে।
শিশু হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোর শিশু ওয়ার্ডে এখন হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।
কেন বাড়ছে হাম?
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি কারণ পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে—
নির্ধারিত সময়ে শিশুদের টিকা না দেয়া
শহর ও গ্রামে টিকাদান কার্যক্রমে অনীহা
গুজব ও ভুল তথ্যের কারণে টিকা সম্পর্কে ভীতি
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত সংক্রমণ
অপুষ্টি ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি
মৌসুমি আবহাওয়াজনিত সংক্রমণ বিস্তার
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম এমন একটি রোগ যা একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে সহজেই ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারে, যদি তাদের টিকা নেয়া না থাকে।
আশার খবর: টিকাদান কর্মসূচিতে রেকর্ড অগ্রগতি
ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছে জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেয়া সম্ভব হয়েছে।
দেশব্যাপী মোট লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন শিশুকে টিকা দেয়া। এর বিপরীতে এখন পর্যন্ত টিকা পেয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার ৪৮ জন শিশু, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০২ শতাংশ।
ঢাকা বিভাগে টিকাদানের হার ১০৩ শতাংশ, চট্টগ্রামে ১০৩ শতাংশ এবং রাজশাহীতেও ১০৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশনে টিকাদানের হার ১১৩ শতাংশ এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১০৯ শতাংশে পৌঁছেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক এলাকায় পূর্বের টিকাবঞ্চিত শিশুরাও এবার টিকার আওতায় এসেছে, ফলে কাভারেজ ১০০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের সতর্কবার্তা:
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নাগরিকদের প্রতি জরুরি সতর্কতা জারি করেছে।
শিশুদের জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
বিশেষ করে অভিভাবকদের উদ্দেশে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলেছেন, “টিকা ছাড়া হাম প্রতিরোধের বিকল্প নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মাঠপর্যায়ে নজরদারি, টিকাদান এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা আরও জোরদার করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
করোনা-পরবর্তী সময়ে নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব এখন হাম পরিস্থিতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
তাদের মতে, শুধু টিকাদান অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসচেতনতা, পুষ্টি উন্নয়ন, স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা জোরদার না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
দেশ যখন ঈদ ও বর্ষা মৌসুমের আগে বড় ধরনের জনসমাগমের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন—এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হাম আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত।



