প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ০২:১৬ পিএম
দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি এবং টিকার সংকট নিয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যে এবার বড় ধরনের তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিশু মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জনমনে। এমন অবস্থায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ তথ্য জানান। সেখানে তিনি বলেন, হামের বিস্তার, টিকার ঘাটতি, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাব্য অবহেলাসহ পুরো পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত পরিচালনা করা হবে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে হামের সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে এবং এতে চার শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে সরকারি পর্যায়ে তথ্য পাওয়া গেছে। এত বিপুল সংখ্যক শিশুমৃত্যুর ঘটনায় সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই সাধারণ ঘটনা নয়। কেন টিকার সংকট তৈরি হলো, টিকা সরবরাহে কোথাও গাফিলতি ছিল কি না, কিংবা দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছে কি না—সব কিছু তদন্তের আওতায় আনা হবে।
তিনি আরো বলেন, তদন্তে যদি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বহীনতা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড উঠে আসে, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকার কোনো ধরনের ছাড় দেবে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হলেও সময়মতো টিকা নিশ্চিত করা গেলে এটি সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় টিকা ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবায় সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে। ফলে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচিতে সামান্য দুর্বলতাও ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। কারণ হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের জন্য এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর প্রভাব বেশি দেখা যায়।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, শুধু তদন্ত করলেই হবে না, একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যবস্থাও আরো শক্তিশালী করতে হবে। হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য হাসপাতালে চিকিৎসা সুবিধা বাড়ানো, প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের পরিস্থিতি আর তৈরি না হয়। এজন্য টিকাদান কর্মসূচিকে আরো কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করার পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হতে পারে।
ব্রিফিংয়ে জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি জানান, দেশে বর্তমানে জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে এবং চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোনো ধরনের জ্বালানি সংকট নেই বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ এখনো কাটেনি। অনেক অভিভাবক অভিযোগ করছেন, বিভিন্ন এলাকায় টিকা সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না। আবার কোথাও কোথাও হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা না পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন অনেকে। ফলে সরকারের তদন্ত উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সচেতন মহল।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করলেই হবে না, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরি। কারণ শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে কোনো অবহেলা পুরো জাতির ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সঠিক পরিকল্পনা, টিকার পর্যাপ্ত মজুত এবং স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে টিকা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং গুজব প্রতিরোধ করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন তারা।
সরকারের পক্ষ থেকে তদন্তের ঘোষণা আসার পর এখন সবার নজর থাকবে সেই তদন্তের ফলাফল এবং পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। কারণ দেশের হাজারো পরিবারের জন্য শিশুদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।



