প্রকাশিত: জুন ২, ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম
বর্ষা মৌসুম ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য বিস্তার মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। ডেঙ্গু প্রতিরোধ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় গাইডলাইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সারাদেশের হাসপাতালগুলোতে বিশেষ প্রস্তুতি গ্রহণ, চিকিৎসক-নার্সদের প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী মজুদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কনফারেন্স রুমে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক আলোচনা সভায় এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত (এম এ মুহিত), প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. জিয়া উদ্দিন হায়দার, স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা। এছাড়া বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিন, বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল হাসপাতাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ সভায় অংশ নেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন- “ডেঙ্গু এখন শুধু একটি মৌসুমি রোগ নয়, এটি একটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। জনগণের সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।”
তিনি জানান, দেশের সকল জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু কর্নার সক্রিয় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় স্যালাইন, পরীক্ষার কিট, ওষুধ ও রক্তের উপাদান মজুদের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। সম্ভাব্য রোগীর চাপ মোকাবিলায় রাজধানীসহ বিভিন্ন অঞ্চলে প্রয়োজন অনুযায়ী ফিল্ড হাসপাতাল প্রস্তুত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন, “ডেঙ্গু পরিস্থিতি অবনতির আগেই আমাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। কোনো রোগী যেন চিকিৎসার অভাবে ভোগান্তির শিকার না হন, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি থাকবে।” তিনি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান জানান।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত বলেন- “প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেই ডেঙ্গুর মতো জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা করতে হবে। মাঠপর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, রোগী রেফারেল এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।”
তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোকে জাতীয় ডেঙ্গু গাইডলাইন অনুসরণ করে চিকিৎসা দিতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নিবেদিত ডেঙ্গু ইউনিট নিশ্চিত করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. জিয়া উদ্দিন হায়দার বলেন- “ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি নাগরিককে এই যুদ্ধে অংশীদার হতে হবে।”
তিনি জানান, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা, রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সভায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলেন- ডেঙ্গু রোগীর দ্রুত শনাক্তকরণ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং জাতীয় চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুসরণ করলে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তারা জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান।
আলোচনা সভা শেষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা জোরদারে সরকারি-বেসরকারি সব অংশীজনকে নিয়ে সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। একই সঙ্গে সারাদেশে সচেতনতামূলক প্রচারণা জোরদার, হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি মূল্যায়ন এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতা। তাই শুধু সরকারের উদ্যোগ নয়, প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণই হতে পারে ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার সবচেয়ে বড় শক্তি।



