রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ডেঙ্গু মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি

চিকিৎসক-নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত স্যালাইন ও কিট সংগ্রহের নির্দেশ 

শহিদুল ইসলাম খোকন

প্রকাশিত: জুন ২, ২০২৬, ০৪:০৩ পিএম

চিকিৎসক-নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত স্যালাইন ও কিট সংগ্রহের নির্দেশ 

ছবি: সংগৃহীত

বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই সম্ভাব্য ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু কর্নার চালু, চিকিৎসক ও নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত স্যালাইন ও পরীক্ষার কিট সংগ্রহ, প্রয়োজনে নতুন ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপনসহ বহুমুখী কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন।

সোমবার স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও চিকিৎসা প্রস্তুতি বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের এক সভায় সভাপতিত্বকালে তিনি এসব কথা বলেন।

সভায় উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডাঃ জাহিদ রায়হান, পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডাঃ হালিমুর রশীদ, পরিচালক (হাসপাতাল) ডাঃ এএইচএম মইনুল আহসান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ চিকিৎসকদের সংগঠন সোসাইটি অব মেডিসিন–এর প্রতিনিধিরা।

পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আগেই প্রস্তুতি: 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে দেশে বিচ্ছিন্নভাবে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হলেও এডিস মশার বিস্তার ও বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে সরকার কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চায় না।

তিনি বলেন, “প্রতিবছর বর্ষা এলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। রোগী বাড়ার অপেক্ষায় না থেকে প্রতিরোধ ও চিকিৎসা—দুই ক্ষেত্রেই আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি।”

মন্ত্রী জানান, দেশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডেঙ্গু কর্নার চালুর কাজ শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে রোগীর চাপ বৃদ্ধি পেলে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় একটি মাঠ হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। প্রয়োজন দেখা দিলে দেশের অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহরেও অস্থায়ী মাঠ হাসপাতাল স্থাপন করা হবে।

চিকিৎসক-নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণ: 

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ডেঙ্গু রোগীর আধুনিক ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সারাদেশে চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, আগামীকাল থেকেই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হবে। ঢাকার বাইরে সাতটি বিভাগীয় শহর এবং জেলা পর্যায়ে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সদের ডেঙ্গু রোগ শনাক্তকরণ, জটিলতা ব্যবস্থাপনা, তরল চিকিৎসা (ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট) এবং জরুরি সেবাদান বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

এ কাজে কারিগরি সহায়তা দেবে সোসাইটি অব মেডিসিন। এছাড়া ইউনিসেফ-সহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।

পর্যাপ্ত স্যালাইন, কিট ও ওষুধ মজুদের নির্দেশ: 
 
ডেঙ্গু চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর মধ্যে রয়েছে শিরায় তরল সরবরাহ (আইভি ফ্লুইড), স্যালাইন, পরীক্ষার কিট এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী।

মন্ত্রী বলেন, “আমাদের কাছে ইতোমধ্যে কিছু পরিমাণ পরীক্ষাগার বিকারক (রিএজেন্ট), পরীক্ষার কিট ও তরল স্যালাইন মজুদ রয়েছে। তবে সম্ভাব্য চাহিদা বিবেচনায় আরও পর্যাপ্ত পরিমাণ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশের কোথাও যেন চিকিৎসা উপকরণের সংকট না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”

সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গে সমন্বিত অভিযান: 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। এ বিষয়ে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দুই মাস আগে থেকেই সিটি কর্পোরেশনগুলোর সঙ্গে সমন্বিত কার্যক্রম শুরু করেছে।

তিনি বলেন, “ডেঙ্গু শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়। এটি জনস্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই মশার উৎস নির্মূলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি কর্পোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একযোগে কাজ করতে হবে।”

এ লক্ষ্যে আগামীকাল আবারও সিটি কর্পোরেশন ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তিনি।

ডেঙ্গু অ্যাপ ও গবেষণার ওপর গুরুত্ব: 

সভায় ডেঙ্গু রোগীদের তথ্য ব্যবস্থাপনা, দ্রুত রিপোর্টিং এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি আধুনিক ডিজিটাল অ্যাপ্লিকেশন (অ্যাপ) চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়।

এছাড়া ডেঙ্গুর বিস্তার, ভাইরাসের ধরন, রোগীর ঝুঁকি এবং কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সময়মতো প্রস্তুতি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, মশার উৎস ধ্বংস এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো গেলে চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুর সম্ভাব্য বড় ধরনের ঝুঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

জনসচেতনতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র: 

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদবাগান, ফুলের টব, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র ও জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে। তাই সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেশবাসীকে নিয়মিত বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা এবং চিকিৎসা অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের মানুষ এখন অপেক্ষা করছে—এই প্রস্তুতি মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তার ওপরই নির্ভর করবে আসন্ন মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতির চিত্র।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!