রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঢাকার প্রধান সড়কে নিষিদ্ধ হচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ০৫:০৯ পিএম

ঢাকার প্রধান সড়কে নিষিদ্ধ হচ্ছে ব্যাটারিচালিত রিকশা

সংগৃহীত

রাজধানীর যানজট ও সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে ব্যাটারিচালিত ও বিদ্যুৎচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে এসব যান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে নিবন্ধন পাওয়া রিকশাগুলো রাজধানীর অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচল করতে পারবে।

রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকা মিলিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল নিয়ন্ত্রণে মোট আটটি অঞ্চল নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিটি অঞ্চলের জন্য আলাদা পরিচয়চিহ্ন বা রং নির্ধারণ করা হতে পারে। একটি অঞ্চলের নিবন্ধিত রিকশা যাতে অন্য অঞ্চলে গিয়ে চলাচল করতে না পারে, সে ব্যবস্থাও রাখা হবে। কোন রিকশা কোন সড়কে চলবে, সেটিও নির্ধারণ করবে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ।

রোববার রাজধানীর সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর সঙ্গে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনারের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সরকারের এ পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে প্রস্তাবিত নীতিমালার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা শেষে দ্রুতই তা জারি করা হতে পারে।

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন নীতিমালা কার্যকর হলে রাজধানীতে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচল করা বিদ্যুৎচালিত রিকশাগুলো একটি নির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় আসবে। শুধু চলাচল নয়, এসব যান তৈরির কারখানা, নিবন্ধন, সক্ষমতা যাচাই, চলাচলের অঞ্চল এবং বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থাকেও নিয়মের মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রধান সড়কে চলবে না

সরকারের পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা সরিয়ে দেওয়া। বর্তমানে নগরীর বিভিন্ন প্রধান ও ব্যস্ত সড়কে এসব ছোট যান চলাচল করতে দেখা যায়। নতুন ব্যবস্থায় অনুমোদিত রিকশাগুলোও মূল সড়কে উঠতে পারবে না। কেবল নির্ধারিত অভ্যন্তরীণ সড়কে তাদের চলাচলের সুযোগ থাকবে।

প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধান সড়কে আলাদা রিকশা চলাচলের পথ তৈরি করা সময়সাপেক্ষ ও জটিল। এ কারণে মূল সড়কে এসব যান চালানোর পরিবর্তে অঞ্চলভিত্তিক অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের ব্যবস্থা করার চিন্তা করা হচ্ছে। এর ফলে ব্যস্ত প্রধান সড়কে যানবাহনের চাপ কমানোর পাশাপাশি রিকশাগুলোর চলাচলও নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা সম্ভব হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে।

ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে মিলিয়ে আটটি অঞ্চলে ভাগ করার পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি অঞ্চলে নিবন্ধিত রিকশাগুলোর জন্য আলাদা পরিচয়চিহ্ন থাকবে। কোনো রিকশা নির্ধারিত এলাকার বাইরে গেলে তা শনাক্ত করার ব্যবস্থাও রাখা হবে। রিকশার চলাচল নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির ব্যবস্থাও পরিকল্পনায় রয়েছে।

ঢাকায় ছয় যাত্রীর রিকশা নিবন্ধন নয়

রাজধানীতে নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও যাত্রী ধারণক্ষমতার ওপর কঠোর সীমা আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, দুই অথবা চারজন যাত্রী বহন করতে পারে—এমন রিকশাই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নিবন্ধনের সুযোগ পাবে।

অন্যদিকে ছয়জন যাত্রী বহন করতে সক্ষম কোনো ব্যাটারিচালিত রিকশাকে ঢাকার সিটি করপোরেশন এলাকায় নিবন্ধন দেওয়া হবে না। অর্থাৎ ঢাকার অভ্যন্তরীণ সড়কে চলাচলের জন্য নির্ধারিত রিকশাগুলোর গঠন ও ধারণক্ষমতা নির্দিষ্ট মানের মধ্যে রাখতে হবে।

তবে রাজধানীর বাইরে নিয়ম কিছুটা ভিন্ন থাকবে। গ্রামীণ এলাকা ও জেলা শহরের গ্রামীণ সড়কে দুই, চার এবং ছয়জন যাত্রী বহন করতে সক্ষম রিকশা নিবন্ধনের সুযোগ রাখার কথা জানিয়েছে সরকার। অর্থাৎ নগরীর সড়ক ব্যবস্থার সঙ্গে গ্রামের পরিবহন প্রয়োজনের পার্থক্য বিবেচনা করেই আলাদা ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে।

কারিগরি সনদ ছাড়া নিবন্ধন নয়

নতুন নীতিমালায় ব্যাটারিচালিত রিকশার কারিগরি মান নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি মান অনুসরণ না করলে কোনো যানকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে না।

প্রতিমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, অন্যান্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় অথবা জেলা পর্যায়ের সরকারি পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠানের মোটরযান প্রকৌশল শাখার প্রত্যয়ন প্রয়োজন হবে। এর পাশাপাশি ট্রাফিক বিভাগের সক্ষমতার সনদও বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থাৎ শুধু রিকশা তৈরি করলেই তা রাজধানীতে চালানোর অনুমতি পাওয়া যাবে না। নির্ধারিত নকশা অনুযায়ী যানটি তৈরি হয়েছে কি না, এর কারিগরি সক্ষমতা ঠিক আছে কি না এবং সড়কে চলাচলের উপযোগী কি না—এসব বিষয় যাচাইয়ের পরই নিবন্ধন দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।

নিবন্ধনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার ওপর থাকবে। ফলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোনো যানকে বৈধভাবে চলাচলের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা নেই।

রিকশা তৈরির কারখানাও আসবে নিয়ন্ত্রণে

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা তৈরির ছোট-বড় কারখানা গড়ে উঠলেও এসব প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ হিসাব সরকারের কাছে নেই বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। নতুন নীতিমালায় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যে আনার কথা বলা হয়েছে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, অনুমোদিত কারিগরি নকশা অনুসরণ করেই এসব যান তৈরি করতে হবে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে।

এর ফলে অনিয়ন্ত্রিতভাবে রিকশা তৈরি এবং বাজারে ছাড়ার প্রবণতা কমানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে যেসব যান সড়কে চলাচলের জন্য তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর নিরাপত্তা ও কারিগরি মান যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

চার্জ দেওয়ার স্থানেও থাকবে নিয়ম

শুধু রিকশার চলাচল ও উৎপাদন নয়, ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার স্থানগুলোকেও নতুন ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। যেসব স্থান থেকে এসব যান চার্জ দেওয়া হবে, সেগুলোর জন্য সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার অনুমোদন নিতে হবে।

সরকার পর্যায়ক্রমে সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে রিকশা চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থা চালুর কথাও ভাবছে। ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট পর্যায়ে এ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।

এর ফলে একদিকে অবৈধ ও অনিরাপদ চার্জ দেওয়ার স্থান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে বিদ্যুতের ওপর চাপ কমিয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত অবকাঠামো তৈরি, নিরাপদ বিদ্যুৎ সংযোগ এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যয় কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নির্দিষ্ট পথেই চলবে রিকশা

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রতিটি নিবন্ধিত রিকশার চলাচলের ক্ষেত্র নির্দিষ্ট করে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। কোন অঞ্চল থেকে কোন এলাকায় রিকশা চলতে পারবে, তা আগে থেকেই নির্ধারণ করা হবে। ফলে চালকের ইচ্ছামতো এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে গিয়ে যাত্রী পরিবহনের সুযোগ সীমিত হবে।

এ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রতিটি অঞ্চলের জন্য আলাদা রং নির্ধারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে দূর থেকেই কোনো রিকশা কোন এলাকার জন্য নিবন্ধিত, তা শনাক্ত করা সহজ হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত এলাকার বাইরে গেলে তা শনাক্ত করার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।

সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে রিকশার পথ নির্ধারণ করবে। ফলে কোনো সড়কে যানজট বেশি হলে সেখানে রিকশার চলাচল সীমিত করা কিংবা বিকল্প পথে পাঠানোর সুযোগ থাকবে।

নীতিমালা কার্যকর হলে কী পরিবর্তন আসতে পারে

নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে যেসব রিকশা নিবন্ধন বা কারিগরি যাচাই ছাড়াই বিভিন্ন সড়কে চলাচল করছে, সেগুলোকে নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আনতে হবে।

প্রথমত, প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, রাজধানীতে চলাচলের জন্য রিকশার যাত্রী ধারণক্ষমতা নির্ধারিত হবে। তৃতীয়ত, কারিগরি সনদ ও সক্ষমতার সনদ ছাড়া নিবন্ধন পাওয়া যাবে না। চতুর্থত, নির্দিষ্ট অঞ্চলের বাইরে চলাচলের সুযোগ সীমিত থাকবে। পঞ্চমত, রিকশা তৈরির কারখানা এবং ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার স্থানগুলোকেও অনুমোদনের আওতায় আনা হবে।

সরকারের দৃষ্টিতে এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশাকে পুরোপুরি বাদ না দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মধ্যে রাখা। কারণ নগরীর অলিগলি ও আবাসিক এলাকার অভ্যন্তরীণ সড়কে স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এসব যান অনেক মানুষের দৈনন্দিন পরিবহনের অংশ হয়ে উঠেছে।

তবে নতুন নিয়ম কার্যকর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বাস্তব প্রয়োগ। বিপুলসংখ্যক চালক, মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এই পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত। তাই নিবন্ধনের শর্ত, যান পরিবর্তন, কারিগরি পরীক্ষা এবং চলাচলের সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের জন্য বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি হবে।

একই সঙ্গে নতুন নিয়ম অমান্য করে কোনো রিকশা যাতে প্রধান সড়কে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন হবে। আটটি অঞ্চলের সীমারেখা নির্ধারণ, আলাদা পরিচয়চিহ্ন, নির্দিষ্ট চলাচলের পথ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

নীতিমালা এখনো চূড়ান্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনা শেষে তা জারি হলে বিস্তারিত নিয়ম ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি স্পষ্ট হবে। এরপর ধাপে ধাপে রাজধানীর ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোকে নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

সব মিলিয়ে, রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল বন্ধ এবং অভ্যন্তরীণ সড়কে অঞ্চলভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালুর পরিকল্পনা ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে এই পরিবর্তন সফল করতে হলে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নিবন্ধন, কারিগরি মান, চালকদের জন্য স্পষ্ট নিয়ম, পর্যাপ্ত অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং নিয়মিত নজরদারি—সবকিছুকে সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!