প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ০৬:০৫ পিএম
মুসলিম দেশগুলোর নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারে প্রস্তাবিত মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, বিশ্বজুড়ে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। মুসলিম বিশ্বের সংকটকালেও সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে চায়।
রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ এবং এর ফলে দেশের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি তৈরি হতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের অভিজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় দায়িত্ব পালন করছে। দেশের শান্তিরক্ষীদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিকভাবেও স্বীকৃত। ফলে মুসলিম বিশ্বের কোনো সংকট বা নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ যদি জাতিসংঘের কাঠামোর অধীনে দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে মুসলিম বিশ্বের সংকটের সময়ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা বাংলাদেশের জন্য স্বাভাবিক বিষয়। এ কারণে মক্কা চুক্তির বিষয়টিকে সরকার ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে।
তবে কোনো জোট বা নিরাপত্তা কাঠামোয় যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথাও স্বীকার করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে রসিকতার সুরে হুমায়ুন কবির বলেন, বাঁচার আগেই মরার চিন্তা করলে কোনো লাভ নেই। তার বক্তব্যে তিনি বোঝাতে চান, কোনো উদ্যোগ গ্রহণের আগেই অতিরিক্ত আশঙ্কায় পিছিয়ে না গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি ও জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
বর্তমান বিশ্বরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এখন আগের মতো স্থির নেই। বিভিন্ন দেশের মধ্যে সম্পর্ক, স্বার্থ ও কৌশলগত অবস্থান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতেও বাস্তবতা অনুযায়ী নমনীয়তা থাকা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষ বা শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ ও সমন্বিত সম্পর্ক বজায় রেখে এগিয়ে যেতে চায়। বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে বাংলাদেশের অবস্থান ইতিবাচক থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সম্পর্ক নিয়েও সন্তোষ প্রকাশ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, ওই অঞ্চলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ও সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হয়েছে।
হুমায়ুন কবিরের মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হচ্ছে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা। এ ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত নানা দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনায় চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সংলাপের বিষয়টিও উঠে আসে। পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক ‘দুই পক্ষের দুই মন্ত্রণালয়’ভিত্তিক কৌশলগত সংলাপ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের সংলাপ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এর মাধ্যমে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধভাবে আলোচনা করার সুযোগ তৈরি হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, এ ধরনের কৌশলগত সংলাপ কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান ও গুরুত্বেরও প্রতিফলন ঘটায়। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা ও সহযোগিতা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা আরও বাড়াচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে আরও শক্তিশালী অবস্থান থেকে সম্পর্ক গড়ে তুলছে।
মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক অবস্থান মূলত মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তিরক্ষায় দেশের দীর্ঘদিনের ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের ওপর কী ধরনের দায়িত্ব বা প্রতিশ্রুতি আসবে, সেটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। একদিকে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার, অন্যদিকে চীনসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা—দুই ক্ষেত্রেই সমন্বিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার বার্তা দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানো নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক শান্তি ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দিয়ে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ করা। মক্কা চুক্তি এবং চীনের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত সংলাপ—দুটি উদ্যোগই সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক নীতির অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে সরকারের অবস্থান আপাতত ইতিবাচক। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে দেশের নিরাপত্তা, কূটনৈতিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।



