প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের ৪৫ বছর পর পুনঃতদন্তে নতুন কিছু তথ্য ও আলামতের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছেন মামলার বিশেষ কৌঁসুলি তানভীর হাসান জোহা। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনকে ঘিরে তদন্তে গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর যোগাযোগের তথ্য, মুঠোফোনের উপাত্ত এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক আলামত।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিলেন, হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং পরবর্তী সময়ে কী ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পুরোনো নথি ও সাক্ষ্যের পাশাপাশি নতুন করে বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
গত ১৫ জুলাই রাতে রাজধানীর বনানী এলাকার একটি বাসা থেকে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে তিনি পলাতক ছিলেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি। গ্রেপ্তারের পর তাঁর কাছ থেকে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যকে কেন্দ্র করে তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
বিশেষ কৌঁসুলি তানভীর হাসান জোহা জানিয়েছেন, মোজাফফরের সঙ্গে দেশ ও দেশের বাইরে থাকা কয়েকজন ব্যক্তির যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর কী ধরনের সম্পর্ক ছিল, কেন দীর্ঘ সময় পর যোগাযোগ করা হয়েছিল এবং তিনি কীভাবে দেশে প্রবেশ করেছিলেন—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একই সঙ্গে দেশে ফেরার পর মোজাফফর কার আশ্রয় বা পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন এবং তাঁর আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন, সেটিও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে।
তদন্তে মোজাফফরের ব্যবহৃত মুঠোফোনের তথ্য বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাঁর ফোনে কিছু সংকেতায়িত বার্তা ও ছবি পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন বিশেষ কৌঁসুলি। এসব বার্তার প্রকৃতি, সেগুলোর মাধ্যমে কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল এবং এর সঙ্গে ১৯৮১ সালের হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
জিয়াউর রহমান হত্যার পর মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরের মৃত্যুর ঘটনাও নতুন করে তদন্তের আওতায় এসেছে। বিশেষ করে মঞ্জুরকে গ্রেপ্তারের পর কীভাবে তাঁকে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল, তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি কী ছিল এবং তৎকালীন সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা কী ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, মঞ্জুরের মৃত্যুর বিষয়ে তৎকালীন নথি, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড ও পরবর্তী সময়ে মঞ্জুরের মৃত্যুর মধ্যে কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।
পুনঃতদন্তে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসের ঘটনাস্থলসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করা হয়েছে। পাশাপাশি পুরোনো সামরিক নথি, গোয়েন্দা প্রতিবেদন, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য দলিল সংগ্রহ করে সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
তদন্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে কথিত একটি ‘গোপন নথি’। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তাঁর কক্ষে বিশেষ একটি নথি খোঁজা হয়েছিল—এমন তথ্য পাওয়ার দাবি করেছেন বিশেষ কৌঁসুলি। নথিটি কী ছিল, কেন সেটি খোঁজা হয়েছিল এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।
এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের সময় ও পরবর্তী ঘটনায় কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও নতুন করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। সে সময়ের জীবিত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। পুরোনো তথ্যের সঙ্গে নতুন পাওয়া আলামত মিলিয়ে ঘটনার ধারাবাহিকতা পুনর্গঠনের চেষ্টা চলছে।
বিশেষ কৌঁসুলির ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়াউর রহমানকে কে গুলি করেছিলেন এবং মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুর কী পরিস্থিতিতে নিহত হন—এই দুই প্রশ্ন এখনো তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ৪৫ বছর পর নতুন প্রযুক্তিনির্ভর আলামত, পুরোনো নথি ও সাক্ষ্য একত্রে বিশ্লেষণ করে এসব অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন পাওয়া তথ্য ও আলামত যাচাই-বাছাই শেষে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব তথ্যকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।



