রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গ্যাসসংকটে শিল্পে বাড়ছে সৌরবিদ্যুতের কদর

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ০৮:২৯ এএম

গ্যাসসংকটে শিল্পে বাড়ছে সৌরবিদ্যুতের কদর

ফাইল ছবি

দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা, গ্যাসের সংকট এবং জ্বালানির বাড়তি ব্যয়ের কারণে শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে সৌরবিদ্যুৎ এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠছে। বিশেষ করে দিনের বেলায় কারখানাগুলোর বিদ্যুতের চাহিদার বড় একটি অংশ ছাদের সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হওয়ায় এ খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ছে।

সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় ইতিমধ্যে ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এর বড় অংশই তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানে স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী নিজেদের কারখানার ছাদে আরও কয়েক শ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নতুন প্রকল্প হাতে নিচ্ছে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সৌরবিদ্যুতের অন্যতম আকর্ষণ হলো উৎপাদন ব্যয়। বর্তমানে গ্রিডের বিদ্যুতের সর্বোচ্চ দাম প্রতি ইউনিট ১১ টাকা ৫৬ পয়সা পর্যন্ত হলেও নিজস্ব বিনিয়োগে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিট খরচ প্রায় চার থেকে সাড়ে চার টাকা। আর অন্য প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে স্থাপিত ব্যবস্থা থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় সাত থেকে আট টাকা। ফলে নিজস্ব বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে সাত টাকার বেশি এবং অন্যের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তিন থেকে সাড়ে চার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।

গ্যাসের সংকটের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র আগের মতো কার্যকরভাবে চালানো যাচ্ছে না। প্রয়োজনের সময় বিকল্প হিসেবে তেলচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেক প্রতিষ্ঠানকে। এতে উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং দিনের বেলায় নির্ভরযোগ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ শিল্পোদ্যোক্তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।

দেশের বেশ কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী ইতিমধ্যে নিজেদের কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান একাধিক কারখানায় এই ব্যবস্থা চালু করেছে এবং ভবিষ্যতে সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। একটি বড় শিল্পগোষ্ঠী বর্তমানে ২০টি কারখানায় প্রায় ৩৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ১০০ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। অন্য একটি শিল্পগোষ্ঠীর কারখানাগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৭৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে এবং আরও ২৮ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত করার কাজ চলছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ছাদে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে। একটি প্রতিষ্ঠান ১০০টি শিল্প-কারখানায় প্রায় ১৩০ থেকে ১৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। আরও কয়েকটি কারখানায় নতুন ব্যবস্থা স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প চালু হলে শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা আরও বাড়বে।

শিল্প খাতের জন্য সৌরবিদ্যুৎ কেবল ব্যয় কমানোর মাধ্যম নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের গুরুত্ব বাড়ায় রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপও বাড়ছে। ফলে তৈরি পোশাকসহ রপ্তানিনির্ভর শিল্পে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।

তবে মাঝারি ও ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রাথমিক বিনিয়োগের অর্থ। দীর্ঘমেয়াদি ও কম সুদের ঋণের সুযোগ না থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে পারছে না। শিল্পসংশ্লিষ্টরা সৌর প্যানেল ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণকারী ব্যাটারি সহজলভ্য করতে কর-সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তাদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার কার্যকাল সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর হওয়ায় শুরুতে বিনিয়োগ করা গেলে দীর্ঘ সময় তুলনামূলক কম ব্যয়ে বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংরক্ষণকারী ব্যাটারি ব্যবহার বাড়ানো গেলে দিনের পাশাপাশি রাতেও সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। এতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা কিছুটা কাটিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে পারবে।

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট উৎপাদন সক্ষমতাও ধীরে ধীরে বাড়ছে। সর্বশেষ হিসাবে দেশে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৮৫০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা ১ হাজার ৫৫৬ মেগাওয়াটের বেশি। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা গেলে একদিকে যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কমবে, অন্যদিকে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপও কমানো সম্ভব হবে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলা, শিল্প উৎপাদন সচল রাখা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ তাই আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!