প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ০১:২৩ পিএম
দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বর্ষাকালে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তির সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। আগস্টে সংক্রমণের যে তীব্রতা দেখা গেছে, তার প্রভাব সেপ্টেম্বরেও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করা না গেলে অক্টোবরেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৪০ হাজার ৪৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩৭ হাজার ১৯৩ জন। একই সময়ে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারিয়েছেন ১১১ জন। ৪ সেপ্টেম্বর সকাল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ২ হাজার ৭৪০ জন। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫১২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই সময়ে ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে এক দিনের রোগী ভর্তি কমে যাওয়াকে পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ডেঙ্গুর প্রকোপ সাধারণত আবহাওয়া, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা এবং এডিস মশার প্রজননের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বর্ষার শেষ ভাগে বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতে মশার বংশবিস্তার বাড়তে থাকায় রোগীর সংখ্যা কিছুটা সময় পর আরও বাড়তে পারে। ফলে সেপ্টেম্বরের পাশাপাশি অক্টোবর মাসকেও ঝুঁকিপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
চলতি বছরের মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানেও ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান চিত্র স্পষ্ট। বছরের প্রথম কয়েক মাসে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও জুন থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ফেব্রুয়ারিতে এই সংখ্যা নেমে আসে ৪০৯ জনে। মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০ এবং মে মাসে ৭১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর জুনে রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯০৭ জনে।
জুলাইয়ে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। ওই মাসে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৯ হাজার ২০৬ জন। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এরপর আগস্টে দেখা যায় আরও বড় উল্লম্ফন। ওই মাসে ২০ হাজার ৫৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। অর্থাৎ জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যাওয়ার সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়।
মৃত্যুর হিসাবেও আগস্ট ছিল বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বছরের শুরুতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকলেও বর্ষার সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়তে থাকে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুইজন করে মারা যান। মে মাসে একজন, জুনে ১৩ জন এবং জুলাইয়ে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়। আগস্টে প্রাণ হারান ৪৩ জন। ফলে চলতি বছরের মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশ এসেছে আগস্ট মাসে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতেও সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে এক দিনে এক হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এরই ধারাবাহিকতায় মাসের শুরুতেই কয়েক দিনে বিপুলসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। যদিও পরবর্তী দিনে নতুন রোগী ভর্তির সংখ্যা কমেছে, তবু সামগ্রিক প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় শুধু হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করলেই হবে না। রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সংক্রমণের উৎস নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন, পুরোনো টায়ারসহ যেসব জায়গায় বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে, সেসব স্থান নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেনের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ কেবল হাসপাতালকেন্দ্রিক হলে চলবে না। রোগ প্রতিরোধের কাজ শুরু করতে হবে মানুষের নিজ নিজ বাড়ি, পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল ও স্থানীয় পর্যায় থেকে। বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণের পাশাপাশি এলাকাভিত্তিকভাবে এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনগণের অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোথায় মশার ঘনত্ব বাড়ছে এবং কোন এলাকায় রোগীর সংখ্যা বেশি—এই দুই বিষয় একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। শুধু মশা নিধনের ওষুধ ছিটিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কোথায় পানি জমছে, কোথায় মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে এবং কোন এলাকায় বেশি রোগী শনাক্ত হচ্ছে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পিত ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ এডিস মশার বড় একটি অংশের প্রজননস্থল মানুষের বসতবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় তৈরি হয়। সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের কর্মীরা নিয়মিত অভিযান চালালেও প্রতিটি বাড়ির ভেতরের পরিস্থিতি প্রতিদিন পর্যবেক্ষণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই নিজেদের বাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব সাধারণ মানুষকেও নিতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চিকিৎসাব্যবস্থার প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকলে রাজধানীর পাশাপাশি দেশের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতেও চাপ বাড়বে। ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোতে রোগী সামলানোর সক্ষমতা তুলনামূলক বেশি হলেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একই ধরনের প্রস্তুতি নাও থাকতে পারে। ফলে জেলা পর্যায়ে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ, পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, জ্বর হলে অবহেলা করা উচিত নয়। ডেঙ্গুর প্রাথমিক উপসর্গ অনেক সময় সাধারণ জ্বরের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু রোগটি গুরুতর পর্যায়ে গেলে দ্রুত শারীরিক অবনতি ঘটতে পারে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর অবস্থা খারাপ হতে পারে। তাই জ্বরের সঙ্গে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘুমঘুম ভাব কিংবা প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ডেঙ্গু শনাক্তের পরীক্ষার সুযোগ সহজলভ্য করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সাধারণ মানুষ যাতে জ্বর হলে দ্রুত পরীক্ষা করাতে পারেন, সে ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে রোগীকে সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া যাবে, অন্যদিকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আসার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।
দেশে ডেঙ্গুর মৌসুমি চরিত্রও এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাধারণত বর্ষাকালে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ বাড়ে। বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকলে সেখানে মশার বংশবিস্তার শুরু হয়। কিন্তু বৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রোগীর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় না। মশার বংশবিস্তার, আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এবং ভাইরাস ছড়ানোর প্রক্রিয়ার কারণে কিছুটা সময় পর সংক্রমণের প্রভাব দৃশ্যমান হয়। এ কারণেই বর্ষার শেষ দিকে এবং শরতের শুরুতে রোগীর সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা দেখা যেতে পারে।
আগস্টের বিপুলসংখ্যক রোগী ভর্তি হওয়ার বিষয়টি সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ একটি মাসে সংক্রমণ বাড়ার পর পরবর্তী কয়েক সপ্তাহেও তার প্রভাব অব্যাহত থাকতে পারে। এর সঙ্গে যদি নতুন করে এডিসের প্রজননস্থল তৈরি হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানও ডেঙ্গুর মৌসুমি ঝুঁকির বিষয়টি সামনে আনে। ২০২৩ সালে সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছিল। ওই মাসে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হন এবং কয়েকশ মানুষের মৃত্যু হয়। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও ডেঙ্গুতে এক লাখের বেশি মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। ২০২৫ সালে দেশে ডেঙ্গুতে ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত গত বছরের তুলনায় মোট রোগী ও মৃত্যুর পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন হলেও আগস্টের দ্রুত ঊর্ধ্বগতি উদ্বেগ তৈরি করেছে। আগস্টেই ২০ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং ৪৩ জনের মৃত্যু দেখিয়েছে যে পরিস্থিতিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এদিকে ডেঙ্গু ভাইরাসের ধরন নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ডেঙ্গুর একটি নির্দিষ্ট ধরন বা সেরোটাইপের উপস্থিতি বেশি পাওয়া যাচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। আগে অন্য ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তির পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ধরনে আক্রান্ত হলে কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে শুধু সেরোটাইপের পরিবর্তনের কারণে প্রত্যেক রোগীর অবস্থা গুরুতর হবে—এমন সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, পূর্বের সংক্রমণ এবং চিকিৎসা পাওয়ার সময়সহ একাধিক বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরকে সামনে রেখে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্তকরণ, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা, দ্রুত রোগ শনাক্তের ব্যবস্থা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সরকারি সংস্থার একার দায়িত্ব নয়। প্রতিটি পরিবার যদি নিজেদের বসতবাড়ি ও আশপাশে পানি জমতে না দেয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখে, তাহলে এডিস মশার বংশবিস্তার অনেকটাই কমানো সম্ভব। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে আগামী অক্টোবরের সম্ভাব্য সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে। অন্যথায় বর্ষার পরও ডেঙ্গুর চাপ অব্যাহত থেকে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।



