প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে সেগুলোকে নিবন্ধন, নির্দিষ্ট নিয়ম ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট পরিচিতি নম্বর দেওয়ার পাশাপাশি কিউআর কোড এবং ডিজিটাল অনুসরণব্যবস্থা যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর ফলে একটি নিবন্ধনের বিপরীতে একাধিক অটোরিকশা চালানোর সুযোগ বন্ধ করার পাশাপাশি যানগুলোর চলাচল ও পরিচয় শনাক্ত করা সহজ হবে।
সোমবার জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর উত্থাপিত নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন মানুষের সহজ ও কম খরচের যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণে সড়ক নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর চাপ বাড়ছে।
সংসদে দেওয়া বক্তব্যে রেহানা আক্তার রানু রাজধানীর সড়কে অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল এবং এসব যান শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা স্থাপনের পর লাল সংকেত অমান্য করা, নির্ধারিত পথ পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত গতিতে চলাচলের মতো বিভিন্ন অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হয়েছে। কিন্তু ব্যাটারিচালিত অনেক অটোরিকশায় নিবন্ধন নম্বর বা নম্বরফলক না থাকায় একই প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, অটোরিকশা এখন শুধু অলিগলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; অনেক সময় রাজধানীর প্রধান সড়কেও এসব যান চলাচল করছে। কাঠামোগত দুর্বলতা ও চালকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাবে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। তবে স্বল্প ভাড়া এবং সহজে পাওয়া যায় বলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের কাছে অটোরিকশার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এ কারণে একেবারে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব যানকে নিয়ন্ত্রণে আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত এক দশকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান দেশের নগর ও গ্রামীণ পরিবহন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। এসব যানকে ঘিরে বিপুলসংখ্যক চালক, মেরামতকর্মী, যন্ত্রাংশ বিক্রেতা, গ্যারেজ মালিক এবং চার্জ দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। ফলে হঠাৎ করে পুরো ব্যবস্থা বন্ধ করলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়তে পারে।
তবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এই যান বাড়তে থাকায় নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলেও জানান তিনি। সরকারের হিসাবে, সারাদেশে আনুমানিক ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান রয়েছে। এগুলো দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। অথচ বৈধ চার্জ দেওয়ার কেন্দ্র রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। শুধু রাজধানীতেই অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ চার্জ দেওয়ার কেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় ৪৮ হাজার বলে ধারণা করা হচ্ছে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে।
পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়টিও সংসদে তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব অটোরিকশায় ব্যবহৃত সিসা-অম্ল ব্যাটারি সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবস্থাপনা ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত না করলে সিসাসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর ফলে বায়ু, মাটি ও পানি দূষণের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ে। অনিরাপদভাবে ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার কারণে আশপাশের বিভিন্ন ব্যবসা ও শিল্পও ক্ষতির মুখে পড়ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, ২০২৫ সালে দেশে মোট ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১ জন নিহত হয়েছেন। এসব দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশের সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সম্পৃক্ততা ছিল বলে তিনি জানান। ফলে জননিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এসব যানকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।
বর্তমানে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল বন্ধ রাখতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যৌথভাবে কাজ করছে। রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে স্থাপিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরার কার্যকারিতা বিবেচনায় নিয়ে আরও ক্যামেরা স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর আরও এলাকায় এ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু স্পষ্ট করে বলেন, তিনি অটোরিকশা নিষিদ্ধ করার দাবি করেননি। বরং এগুলোকে নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট এলাকা এবং নিয়ন্ত্রিত চলাচলের আওতায় আনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া প্রতিদিন নতুন নতুন অটোরিকশা রাস্তায় নামলে বিদ্যুৎ ব্যবহার ও যানজট—দুই সমস্যাই আরও বাড়বে।
তিনি অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট অঞ্চলভিত্তিক চলাচলব্যবস্থা, নিবন্ধন, চালকদের প্রশিক্ষণ ও বৈধ অনুমতিপত্রের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎনির্ভর চার্জ দেওয়ার অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তার মতে, এসব ব্যবস্থা চালু করা গেলে একদিকে চালকদের কর্মসংস্থান বজায় থাকবে, অন্যদিকে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, স্থানীয় সরকার বিভাগের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে অটোরিকশা ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা ইতোমধ্যে তৈরি করা হয়েছে। ওই নীতিমালার অন্যতম লক্ষ্য হলো চালকদের জীবিকা অক্ষুণ্ন রেখে যানগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
নতুন ব্যবস্থায় অটোরিকশার নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে প্রযুক্তিনির্ভর করা হবে। প্রতিটি অনুমোদিত অটোরিকশায় কিউআর কোড যুক্ত থাকবে এবং নির্দিষ্ট পরিচিতি নম্বরের মাধ্যমে সেটিকে শনাক্ত করা যাবে। একই পরিচিতি ব্যবহার করে একাধিক অটোরিকশা চালানোর সুযোগ যাতে না থাকে, সে বিষয়েও নজরদারি থাকবে। ফলে কোনো যান নিয়ম ভাঙলে তার মালিকানা ও পরিচয় শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
এ ছাড়া পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে পুরোনো সিসা-অম্ল ব্যাটারির পরিবর্তে তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব ব্যাটারি ব্যবহারের শর্ত আরোপ করা হবে। চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থাপনাকেও ধীরে ধীরে নিয়মের মধ্যে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে যেসব যান অনেক ক্ষেত্রে নিবন্ধন ও পরিচয়বিহীনভাবে চলাচল করছে, সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট পরিচিতির আওতায় আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ব্যবহারে শৃঙ্খলা এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়গুলোও নীতিমালার আওতায় আসবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থ, সড়ক নিরাপত্তা, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং মানুষের কর্মসংস্থানের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত নতুন ব্যবস্থার পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে। এর ফলে অটোরিকশা বন্ধের পরিবর্তে একটি নিবন্ধিত, নিয়ন্ত্রিত ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে সামনে এসেছে।



