প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১১, ২০২৬, ১০:১৫ এএম
বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের প্রভাবে গরমের তীব্রতা বাড়ার মধ্যেই দেশে আবারও বিদ্যুৎ সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ায় উৎপাদন কমেছে। সর্বশেষ ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ সরবরাহকারী আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট এবং দেশের আরএনপিএলের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে। এর ফলে বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির হিসাব অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বেলা ৩টার দিকে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট। ফলে ওই সময়ে চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট। দিনের সর্বোচ্চ চাহিদা বিবেচনায় নিলে প্রকৃত ঘাটতি আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের উৎপাদন বিভাগের একজন সদস্য জানান, হঠাৎ করে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ইউনিটটি দ্রুত সচল করার জন্য মেরামতের কাজ চলছে। একই সময়ে আরএনপিএলের একটি ইউনিটও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। দুটি কেন্দ্রের ইউনিট বন্ধ হওয়ার কারণে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি নতুন করে তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের সামগ্রিক চিত্র বিশ্লেষণ করলেও সংকটের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বুধবার রাত ১১টার দিকে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট থেকে কমে ৭৫৮ মেগাওয়াটে নেমে আসে। একই সময়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদনও কমেছে। এক দিন আগে এসব কেন্দ্র থেকে যেখানে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল, সেখানে তা কমে প্রায় ৪ হাজার ৮৫৭ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে।
শুধু কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র নয়, কারিগরি ত্রুটির কারণে গ্যাসভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও উৎপাদনের বাইরে রয়েছে। আশুগঞ্জের ৪৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কেন্দ্র বুধবার পর্যন্ত ৩১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও পরে কারিগরি সমস্যার কারণে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।
এর পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণেও বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। শুধু ঢাকা অঞ্চলের অন্তত সাতটি কেন্দ্র হয় বন্ধ রয়েছে, নয়তো সীমিত সক্ষমতায় চলছে। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলেও একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক থাকার পর লোডশেডিংয়ের মাত্রা নতুন করে বেড়ে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন নগর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষ।
শহরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও দিনে চারবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কিছু এলাকায় দিনে সাত থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।
গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে বাড়তি দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষদের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র শিল্পকারখানাগুলোও সমস্যায় পড়ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু করা এবং গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



