প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ০৪:৫৫ পিএম
চট্টগ্রাম অভিমুখে ১১ দলীয় রাজনৈতিক জোটের লংমার্চ কর্মসূচিতে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হলে সরকারকে জনরোষের মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার দাবি, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচিতে সরকারি দল, সহযোগী সংগঠন কিংবা প্রশাসনের কোনো অংশ বাধা সৃষ্টি করলে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা আরও কমে যেতে পারে।
শুক্রবার রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। ১১ দলীয় জোটের চট্টগ্রামমুখী লংমার্চের সর্বশেষ প্রস্তুতি ও কর্মসূচির বিভিন্ন দিক তুলে ধরতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। গোলাম পরওয়ার এই লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আগামী শনিবার ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে লংমার্চ শুরু হবে। কর্মসূচিটি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে সম্পন্ন করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার উৎখাতের কোনো পরিকল্পনা নেই বলেও তিনি দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বিরোধী দলগুলো সংসদের ভেতরে এবং রাজপথে নিয়মতান্ত্রিক ও গঠনমূলকভাবে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছে।
সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, লংমার্চ সফলভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের সহযোগিতা থাকা প্রয়োজন। এতে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বজায় থাকবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বাধা বা প্রতিকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি না করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য, সরকারি দল কিংবা প্রশাসনের কোনো অংশ যদি লংমার্চে অংশগ্রহণকারীদের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব সরকারের ওপরই পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারকে জনরোষের মুখোমুখি হতে হতে পারে। তবে সরকার এমন কোনো পদক্ষেপ নেবে না বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আগামী শনিবার সকাল থেকে এই লংমার্চ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আয়োজকদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে রাজধানীর শাপলা চত্বরে প্রথম সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর লংমার্চের বহর নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোডের দিকে যাবে। সেখানে একটি পথসভা হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপাল এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে আরও কয়েকটি পথসভা অনুষ্ঠিত হবে।
সবশেষে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে বড় সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি হওয়ার কথা রয়েছে। আয়োজকদের ধারণা, পথে যানজট কিংবা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি না হলে সন্ধ্যার দিকে লংমার্চের বহর চট্টগ্রামে পৌঁছাতে পারে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে বলেও জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
দীর্ঘ পথযাত্রায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। গোলাম পরওয়ার বলেন, পথসভাগুলো দীর্ঘ করা হবে না। ১১ দলের প্রত্যেক নেতাকে প্রতিটি স্থানে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না। স্থানীয় পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দল ও সংগঠনের নেতা-কর্মীরা পথসভাগুলোতে উপস্থিত থাকবেন। তবে মূল গাড়িবহরে থাকা নেতা-কর্মীরা প্রতিটি স্থানে নেমে সভায় অংশ নেবেন না। নির্ধারিত বক্তারাই শুধু সেখানে বক্তব্য দেবেন।
লংমার্চে অংশগ্রহণকারীদের ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিস্তারিত পরিকল্পনার কথা জানান আয়োজকেরা। অংশগ্রহণকারীদের জন্য পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বহরে থাকা বাসগুলোতে বিশেষ পরিচিতিচিহ্ন থাকবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক দল ও অ্যাম্বুলেন্স রাখার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। দলের সাংস্কৃতিক ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের জন্যও আলাদা গাড়ির ব্যবস্থা থাকবে।
লংমার্চের পথে নতুন করে আরও কিছু গাড়ি বহরে যুক্ত হতে পারে বলেও জানানো হয়েছে। তবে নতুন যুক্ত হওয়া গাড়িগুলো মূল বহরের শেষ অংশে থাকবে বলে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এতে বহরের শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি চলাচল নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হবে বলে মনে করছেন তারা।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন গোলাম পরওয়ার। তিনি দাবি করেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, সংসদের প্রথম অধিবেশনের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের যে প্রত্যাশা ছিল, তা পূরণ হয়নি।
তিনি বলেন, সরকারকে এসব বিষয়ে সংসদে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কত সময় প্রয়োজন, সে বিষয়ে জনগণের সামনে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন জামায়াতের এই নেতা। তার দাবি, অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হলেও নৃশংসতা, লুটপাট, দলীয়করণ ও বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব ছিল। কিন্তু সরকার সে ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গোলাম পরওয়ার আরও অভিযোগ করেন, দেশে রাজনৈতিকভাবে উত্তেজনাকর বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং উসকানিমূলক তৎপরতা বাড়ছে। তার মতে, সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল রাখা।
এদিকে ১১ দলীয় জোটের লংমার্চ নিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও কথা বলেন। তিনি জানান, এখন পর্যন্ত লংমার্চকে ঘিরে নাশকতা বা বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা তারা করছেন না। তার দাবি, ১১টি দল ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মসূচিতে অংশ নিলে কোনো ধরনের দুষ্কৃতকারী সহজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ পাবে না।
তবে কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে হামলা বা বিশৃঙ্খলা হলে এর দায় সরকারের ওপর বর্তাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে জোটের পক্ষ থেকে কঠোর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখানোর কথাও জানান।
লংমার্চের প্রস্তুতি নিয়ে এর আগে জোটের নেতাদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কর্মসূচির সার্বিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা, যানবাহন পরিচালনা, পথসভা এবং চট্টগ্রামে সমাপনী সমাবেশ নিয়ে আলোচনা হয়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পুরো কর্মসূচিতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষের চলাচলে যাতে অপ্রয়োজনীয় দুর্ভোগ তৈরি না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হবে। পথসভাগুলো সংক্ষিপ্ত রাখার পাশাপাশি গাড়িবহর পরিচালনায় নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসরণ করা হবে।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামমুখী ১১ দলীয় জোটের লংমার্চকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ রাখার কথা বলা হলেও এর আগে থেকেই সরকারের সহযোগিতা ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এখন কর্মসূচির দিন বাস্তবে পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, সেটিই দেখার বিষয়।



