রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

অবশেষে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন মেসি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৬, ০৯:৫৯ পিএম

অবশেষে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন মেসি

সংগৃহীত

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র লিওনেল মেসি অবশেষে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। দীর্ঘ ২১ বছরের আন্তর্জাতিক পথচলার পর সোমবার নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান ৩৯ বছর বয়সী এই মহাতারকা। এর মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে মেসির বর্ণিল অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি হলো।

মেসির বিদায়ের সিদ্ধান্তে ফুটবল বিশ্বে নেমে এসেছে আবেগঘন পরিবেশ। যে খেলোয়াড়ের পায়ের জাদুতে কোটি কোটি সমর্থক বছরের পর বছর মুগ্ধ হয়েছেন, সেই খেলোয়াড় আর জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামবেন না। তবে তাঁর বিদায় কোনো ব্যর্থতার গল্প দিয়ে নয়; বরং বিশ্বকাপ, মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব এবং অসংখ্য ব্যক্তিগত অর্জনে সমৃদ্ধ এক দীর্ঘ যাত্রার পরেই এসেছে এই সিদ্ধান্ত।

২০২৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হওয়ার পরই মেসি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন। তিনি জানিয়েছেন, ফাইনালের দুই দিন পর, ২১ জুলাই তিনি অবসরের সিদ্ধান্তের কথাগুলো লিখে রেখেছিলেন। পরে বাবার মৃত্যুর পর সিদ্ধান্তটি আরও দৃঢ় হয়।

বিদায়ী বার্তায় মেসি জানিয়েছেন, সিদ্ধান্তটি নেওয়া তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। তবে দীর্ঘ সময় চিন্তা করার পর তিনি বুঝতে পেরেছেন, এটাই সরে দাঁড়ানোর উপযুক্ত সময়। জাতীয় দলের হয়ে দীর্ঘ পথচলায় তিনি নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও উল্লেখ করেন।

মেসির বিদায়ী বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আর্জেন্টিনার জার্সির প্রতি তাঁর ভালোবাসা। কঠিন সময়েও দলের হয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি জানান, সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানো এবং দেশের মানুষের মধ্যে গর্ব তৈরি করাই ছিল তাঁর অন্যতম বড় প্রেরণা। এখন থেকে মাঠে না নেমে গ্যালারি কিংবা মাঠের বাইরে একজন সাধারণ সমর্থকের মতোই আর্জেন্টিনার পাশে থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।

মেসির আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নামার মাত্র কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই লাল কার্ড দেখে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা হয়েছিল হতাশায়। কিন্তু সেই শুরুর পর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের প্রধান ভরসা এবং দলের অধিনায়ক।

২০০৬ সালের বিশ্বকাপে মাত্র ১৮ বছর বয়সে মেসি প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে গোল করেন। এরপর একের পর এক বিশ্বকাপ আসরে তিনি আর্জেন্টিনার অন্যতম প্রধান তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। ২০১৪ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হলেও পুরো প্রতিযোগিতায় অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান মেসি।

২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েও শেষ পর্যন্ত ফিরে আসেন তিনি। সেই প্রত্যাবর্তনের পরই শুরু হয় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল অধ্যায়। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২১ সালে ব্রাজিলকে হারিয়ে আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকার শিরোপা এনে দেন মেসি। জাতীয় দলের হয়ে সেটিই ছিল তাঁর প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা।

এর পরের বছরই আসে আরও বড় সাফল্য। ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে আন্তমহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা জয়ের পর কাতার বিশ্বকাপে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা পৌঁছে যায় ফাইনালে। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে নির্ধারিত সময় ও অতিরিক্ত সময় শেষে সমতা থাকায় খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। শেষ পর্যন্ত জয় পায় আর্জেন্টিনা। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে ফেরে দেশটি। মেসি পান প্রতিযোগিতার সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি।

২০২৪ সালেও আন্তর্জাতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখে আর্জেন্টিনা। কোপা আমেরিকার ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বার মহাদেশীয় শিরোপা জেতে তারা। ফলে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা একের পর এক বড় শিরোপা জয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করে।

২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়। এই আসরে তিনি ইতিহাসে বিরল এক মাইলফলক স্পর্শ করেন। ষষ্ঠবারের মতো বিশ্বকাপের আসরে অংশ নেন তিনি এবং বিশ্বকাপে নিজের ম্যাচসংখ্যা বাড়িয়ে ৩৪-এ নিয়ে যান। বিশ্বকাপের ফাইনালেও মাঠে নেমে রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করেন। শেষ পর্যন্ত স্পেনের কাছে পরাজিত হয়ে রানার্সআপ হয় আর্জেন্টিনা। ফিফার তথ্য অনুযায়ী, ওই ফাইনালে মেসি ৩৪তম বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ উপস্থিতির রেকর্ড আরও শক্ত করেন।

আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে মেসি আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ও সবচেয়ে বেশি গোল করা খেলোয়াড় হিসেবে বিদায় নিচ্ছেন। তাঁর জাতীয় দলের পরিসংখ্যানে রয়েছে ২০৭ ম্যাচ ও ১২৫ গোল। এই দুই ক্ষেত্রেই তিনি আর্জেন্টিনার সর্বকালের শীর্ষে।

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জনের তালিকায় রয়েছে একটি বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা এবং একটি আন্তমহাদেশীয় শিরোপা। এর পাশাপাশি তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিরল কৃতিত্বও রয়েছে তাঁর। ২০১৪ সালে শিরোপার খুব কাছে গিয়েও ব্যর্থ হওয়া, ২০২২ সালে কাঙ্ক্ষিত বিশ্বকাপ জয় এবং ২০২৬ সালে আবারও ফাইনালে উঠে পরাজয়—এই তিন অধ্যায় তাঁর আন্তর্জাতিক জীবনের ভিন্ন ভিন্ন আবেগকে তুলে ধরে।

তবে মেসির পথচলা সব সময় মসৃণ ছিল না। একসময় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জিততে না পারার কারণে তাঁকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়ের পর তাঁর অবসরের ঘোষণা সেই হতাশারই বহিঃপ্রকাশ ছিল। কিন্তু দেশের মানুষের ভালোবাসা ও সতীর্থদের আহ্বানে তিনি ফিরে আসেন। এরপরই বদলে যায় গল্প।

পরবর্তী সময়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি শুধু সাফল্যই পাননি, একই সঙ্গে নিজের দীর্ঘদিনের সমালোচকদেরও জবাব দিয়েছেন। ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ধারাবাহিক আন্তর্জাতিক শিরোপা এবং ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয় তাঁর ক্যারিয়ারের অসম্পূর্ণ অধ্যায়গুলো পূর্ণ করে দেয়।

বিদায়ী বার্তায় মেসি নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের প্রতিও আস্থা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, আর্জেন্টিনা দলে উঠে আসা অনেক তরুণ খেলোয়াড় এখন নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের অপেক্ষায় রয়েছে এবং তাদের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন। নিজের জায়গা ছেড়ে দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়টিও তাঁর সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ।

মেসির বিদায় তাই শুধু একজন ফুটবলারের অবসর নয়; এটি আর্জেন্টিনা ফুটবলের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। তাঁর পায়ের জাদু, গোল, নেতৃত্ব, কান্না, হতাশা এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ জয়ের মুহূর্ত—সবকিছু মিলিয়ে জাতীয় দলের হয়ে তাঁর পথচলা হয়ে থাকবে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় কাহিনি।

আর্জেন্টিনার হয়ে শেষবার মাঠে নামার পর এবার মেসির আন্তর্জাতিক অধ্যায় থেমে গেল। তবে ক্লাব ফুটবলে তাঁর পথচলা এখনই শেষ হচ্ছে না। জাতীয় দলের জার্সি আর গায়ে না তুললেও ক্লাব পর্যায়ে খেলা চালিয়ে যাবেন তিনি।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী হয়ে থাকা মেসি এবার মাঠের বাইরে থেকে প্রিয় দলকে সমর্থন করবেন। তাঁর নিজের ভাষায়, এত বছরের ভালোবাসা তিনি কখনো ভুলবেন না। আর সমর্থকদের কাছেও মেসির বিদায় মানে শেষ নয়—বরং ফুটবলের সবচেয়ে উজ্জ্বল এক অধ্যায়কে স্মৃতিতে ধরে রাখার নতুন শুরু।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!