প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম
দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে নতুন করে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, শিক্ষার প্রকৃত মান কতটা উন্নত হয়েছে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এক কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত “বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা রূপান্তর : টেকসই উৎকর্ষতার পথরেখা” শীর্ষক এই কর্মশালার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং নীতিনির্ধারকেরা উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে ৫৭টিতে পৌঁছেছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে সংখ্যার দিক থেকে এগিয়ে গেলেও শিক্ষার গুণগত মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। তিনি মনে করেন, শিক্ষা এমন হতে হবে যা শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের চাহিদা পূরণে সক্ষম করে তুলবে।
তিনি আরো বলেন, বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শিক্ষাক্রম ও পাঠদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতেই হবে। শুধু মুখস্থনির্ভর শিক্ষা নয়, বরং দক্ষতা, গবেষণা, সৃজনশীলতা এবং বাস্তব জ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন কর্মক্ষেত্রে গিয়ে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে, সেই ধরনের শিক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
ড. মিলন জানান, সরকার ইতোমধ্যে নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, একসময় বিদেশি শিক্ষকরা বাংলাদেশে এসে পাঠদান করতেন এবং বিদেশি শিক্ষার্থীরাও এখানে পড়াশোনা করতে আগ্রহ দেখাতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিবেশ অনেকটাই কমে গেছে। ফলে দেশের উচ্চশিক্ষাকে আবারও আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
তিনি মনে করেন, শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে প্রযুক্তি ও গবেষণার সমন্বয় ঘটাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু সনদনির্ভর না করে দক্ষ ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
কর্মশালায় উপস্থিত শিক্ষাবিদদের অনেকেই বলেন, দেশে উচ্চশিক্ষা দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও গবেষণার মান, অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। বিশেষ করে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত গবেষণা সুবিধা ও আধুনিক শিক্ষাসামগ্রীর ঘাটতি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষাব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে বেকারত্ব, দক্ষ মানবসম্পদের অভাব এবং পাঠ্যক্রমের সঙ্গে কর্মক্ষেত্রের অমিল। ফলে অনেক শিক্ষার্থী সনদ অর্জনের পরও চাকরির বাজারে নিজেদের যোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারছেন না।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে একজন শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করাই নয়, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তিনি মনে করেন, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং দায়িত্ববোধও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
কর্মশালায় উচ্চশিক্ষা নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, গবেষণার উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এসব আলোচনা ভবিষ্যতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সহায়ক হবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বর্তমান যুগে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন যুগোপযোগী শিক্ষা, দক্ষ শিক্ষক এবং গবেষণাবান্ধব পরিবেশ। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিকাশের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
অনেকের মতে, বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাতে পারলে দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং সামাজিক উন্নয়নেও বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ দক্ষ ও জ্ঞানভিত্তিক মানবসম্পদই একটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের মূল শক্তি।
সরকারের নতুন উদ্যোগ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে দেশের শিক্ষা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদরা। তবে সেই পরিবর্তন বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কার্যকর নীতিমালা এবং সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন বলেও মনে করছেন তারা।



