প্রকাশিত: আগস্ট ৩০, ২০২৬, ১১:৩৯ এএম
বয়সকে কখনোই শেখার পথে বাধা হতে দেননি মো. বেলায়েত শেখ। দীর্ঘ বিরতির পর জীবনের নতুন অধ্যায়ে ফিরে এসে ৫৯ বছর বয়সে স্নাতক সম্মান সম্পন্ন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। তার এই অর্জন শুধু একটি শিক্ষাগত সনদ অর্জনের গল্প নয়; বরং দীর্ঘদিনের অপূর্ণ স্বপ্ন, প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই এবং অধ্যবসায়ের এক অনুপ্রেরণামূলক কাহিনি।
স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, যোগাযোগ ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ থেকে স্নাতক সম্মান সম্পন্ন করেছেন বেলায়েত শেখ। গত ১৮ আগস্ট চূড়ান্ত মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার দীর্ঘ বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের আনুষ্ঠানিক অধ্যায়। ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুতি নিয়ে তিনি ক্যাম্পাসে যান এবং নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষকদের সামনে নিজের পড়াশোনার নানা বিষয় নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন।
মৌখিক পরীক্ষায় তাকে কয়েক বছর আগের বেলায়েতের সঙ্গে বর্তমান বেলায়েতের পার্থক্য জানতে চাওয়া হয়। উত্তরে তিনি জানান, একসময় তার সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল কীভাবে অনার্সের পড়াশোনা শেষ করবেন। এখন তার উপলব্ধি—আন্তরিক ইচ্ছা, নিয়মিত চেষ্টা এবং অধ্যবসায় থাকলে জীবনের যেকোনো বয়সেই মানুষ নতুন কিছু অর্জন করতে পারেন।
তবে এই অর্জনের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। ১৯৬৮ সালে গাজীপুরের শ্রীপুরে এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া বেলায়েত ছোটবেলা থেকেই শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে সেই স্বপ্ন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের ব্যয়ভার সামলাতে বিভিন্ন কাজ করতে হয়েছে তাকে।
১৯৮৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী থাকলেও অর্থাভাবে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরীক্ষার আবেদন করার জন্য জোগাড় করা অর্থও শেষ পর্যন্ত অসুস্থ বাবার চিকিৎসায় ব্যয় করতে হয়। এরপর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য থেমে যায় তার শিক্ষাজীবন।
কিন্তু থেমে থাকা স্বপ্ন একদিন আবার জেগে ওঠে। প্রায় ৫০ বছর বয়সে বেলায়েত নতুন করে পড়াশোনায় ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। ২০১৭ সালে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ২০১৯ সালে ৪ দশমিক ৪৩ জিপিএ নিয়ে মাধ্যমিক এবং ২০২১ সালে ৪ দশমিক ৫৮ জিপিএ নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, যোগাযোগ ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগে ভর্তি হয়ে শুরু করেন তার বিশ্ববিদ্যালয়জীবন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বয়সের পার্থক্যও তাকে থামাতে পারেনি। নিজের তুলনায় অনেক কম বয়সী সহপাঠীদের সঙ্গে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত হয়েছেন, শিক্ষা সফর ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছেন। ভাষাগত দুর্বলতা নিয়েও তিনি পিছিয়ে যাননি। নিয়মিত পড়াশোনা, অনুবাদের সহায়তা এবং নিজের চেষ্টায় ধীরে ধীরে পাঠ্যক্রমের সঙ্গে মানিয়ে নেন। শিক্ষকরাও তাকে উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়েছেন।
বেলায়েতের বিভাগের একজন শিক্ষক জানান, শেখার প্রতি তার আগ্রহ এবং পরিশ্রম ছিল প্রশংসনীয়। গাজীপুর থেকে নিয়মিত ক্যাম্পাসে এসে ক্লাস করেছেন তিনি। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি তার জীবনযাত্রা তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছেও অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
স্নাতক সম্মান অর্জনের পরও থেমে যাওয়ার পরিকল্পনা নেই বেলায়েতের। তিনি বর্তমানে সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত এবং শ্রীপুরে সংবাদ সংগ্রহের কাজ করেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতে মফস্বল সাংবাদিকতা নিয়ে উচ্চতর গবেষণা করতে চান তিনি। স্নাতকোত্তর শেষে এ বিষয়ে পিএইচডি করারও ইচ্ছা রয়েছে তার।
বেলায়েতের কাছে বয়স কোনো সীমারেখা নয়। বরং তার বিশ্বাস, শেখার আগ্রহ থাকলে জীবনের যেকোনো সময় নতুন করে পথচলা শুরু করা যায়। ৫৯ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে তিনি যেন সেই বিশ্বাসকেই বাস্তব উদাহরণে পরিণত করেছেন।



