প্রকাশিত: মে ১২, ২০২৬, ০৪:০১ পিএম
দেশের জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের আমদানি নির্ভর নীতির কঠোর সমালোচনা করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেছেন, দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি করা হয়েছিল, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। বর্তমান সরকার দেশীয় সম্পদকে কাজে লাগিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি এলাকায় আয়োজিত এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং মধ্যপাড়া পাথর খনির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।
মন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়ন ও শিল্পখাত সচল রাখতে জ্বালানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অথচ অতীতে দেশীয় কয়লা, গ্যাস ও খনিজ সম্পদের যথাযথ ব্যবহার না করে বিদেশি জ্বালানি আমদানির পথকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বেড়েছে, অন্যদিকে দেশের নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
তিনি আরো বলেন, জনগণের সম্পদ জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। দেশের মাটির নিচে যে সম্পদ রয়েছে, তা সঠিকভাবে উত্তোলন ও ব্যবহার করা গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা আসবে। বিদেশি জ্বালানির দামের ওঠানামার কারণে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, দেশীয় সম্পদের ওপর নির্ভরতা বাড়ালে সেই ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে আসবে।
বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী জানান, কয়লার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে নীতিগত আলোচনা করেছে। খুব শিগগিরই এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হবে। যদিও তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি, তবে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, সরকার দেশীয় কয়লা উত্তোলন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে নতুন কৌশল গ্রহণ করতে যাচ্ছে।
সভায় উপস্থিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে মন্ত্রী কয়লাখনি ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়েও খোঁজখবর নেন। তিনি বলেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু নতুন প্রকল্প হাতে নিলেই হবে না, বিদ্যমান প্রকল্পগুলোকেও আধুনিক ও কার্যকর রাখতে হবে।
জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, সরকার চায় দেশের খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম আরো বিস্তৃত করতে। বিশেষ করে কয়লা, গ্যাস ও পাথর খাতকে ঘিরে নতুন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, হুইপ আক্তারুজ্জামান মিয়া, দিনাজপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ জেড এম রেজওয়ানুল হক, দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর আলমসহ স্থানীয় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সফরসূচির অংশ হিসেবে জ্বালানি মন্ত্রী মধ্যপাড়া গ্রানাইট খনি পরিদর্শন করেন। সেখানে উৎপাদন কার্যক্রম এবং শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ সম্পর্কে অবহিত হন তিনি। পরে বড়পুকুরিয়া খনি শ্রমিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে বলে জানা গেছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ববাজারে জ্বালানির মূল্য অস্থির হয়ে ওঠার কারণে বর্তমানে অনেক দেশই নিজেদের সম্পদের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশও যদি নিজস্ব কয়লা ও গ্যাস সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে, তবে ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে পরিবেশবিদরা বলছেন, কয়লা উত্তোলন ও ব্যবহার বাড়ানোর ক্ষেত্রে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রা, কৃষিজমি ও পরিবেশের ক্ষতি যেন না হয়, সে বিষয়েও কার্যকর পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।
সরকারের নতুন অবস্থান ও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা কমে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



