প্রকাশিত: মে ১৬, ২০২৬, ০২:২৩ পিএম
দেশের টেলিযোগাযোগ খাতকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও জনমুখী করতে বড় ধরনের সংস্কারের ইঙ্গিত দিল নতুন সরকার। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে ইন্টারনেট সেবার মানোন্নয়ন, গ্রামাঞ্চলে দ্রুতগতির নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার, কলড্রপ ও উচ্চমূল্যের ইন্টারনেট সমস্যার সমাধান এবং তরুণদের জন্য প্রযুক্তিখাতে নতুন কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
টেলিকম খাতের ভবিষ্যৎ:
নতুন সরকার কি ভাবছে?” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এমপি।
রাজধানীতে আয়োজিত এ গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নেন টেলিকম বিশেষজ্ঞ, মোবাইল অপারেটর প্রতিনিধি, তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তা, গবেষক, শিক্ষাবিদ, তরুণ উদ্ভাবক এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিকরা। বৈঠকে দেশের টেলিকম খাতের বর্তমান সংকট, সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী বলেন-
“প্রযুক্তি এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের অংশ। শহর ও গ্রামের ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে প্রতিটি নাগরিকের হাতে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে।”
তিনি জানান, আগামী কয়েক বছরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দিতে ফাইভ-জি প্রযুক্তি, অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক সংযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরও বলেন,
“দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা কেন্দ্র এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করবে।”
গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, বর্তমানে দেশের কোটি কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও সেবার মান নিয়ে ভোগান্তি এখনও বড় সমস্যা। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় দুর্বল নেটওয়ার্ক, ধীরগতির ইন্টারনেট, অতিরিক্ত ডাটা মূল্য এবং অনিয়মিত সংযোগ সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল শিক্ষা, অনলাইন স্বাস্থ্যসেবা, ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং ও স্মার্ট গভর্নেন্সের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করছে শক্তিশালী টেলিকম অবকাঠামোর ওপর।
বৈঠকে বক্তারা আরও বলেন-
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো প্রযুক্তিনির্ভর খাতে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে এখনই দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া তরুণ প্রযুক্তি উদ্যোক্তারা স্টার্টআপ খাতে সহজ বিনিয়োগ, দ্রুত ইন্টারনেট, প্রযুক্তি গবেষণায় সরকারি অনুদান এবং উদ্ভাবনী প্রকল্পে কর-সুবিধা দেওয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে সাধারণ গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—
কলড্রপ, অনাকাঙ্ক্ষিত এসএমএস, দুর্বল নেটওয়ার্ক এবং উচ্চমূল্যের ইন্টারনেট প্যাকেজ—নিয়ে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেন মন্ত্রী। তিনি বলেন,
গ্রাহকের অধিকার রক্ষায় প্রয়োজন হলে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। জনগণ যেন টাকার বিপরীতে মানসম্মত সেবা পায়, সেটিই সরকারের অঙ্গীকার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের টেলিকম খাত এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এই সময়ে সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছ নীতিমালা ও কার্যকর বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী ডিজিটাল অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।
গোলটেবিল বৈঠকের শেষদিকে অংশগ্রহণকারীরা একটি আধুনিক, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেলিকম ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকার, বেসরকারি খাত ও প্রযুক্তিবিদদের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানজুড়ে একটি বিষয়ই বারবার উঠে আসে
“ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে প্রযুক্তিনির্ভর; আর সেই ভবিষ্যতের মেরুদণ্ড হবে শক্তিশালী, সাশ্রয়ী ও মানবিক টেলিকম ব্যবস্থা।”



