রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

এবার আর কাউকে মাফ করা হবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী 

শহিদুল ইসলাম খোকন

প্রকাশিত: জুন ৪, ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম

এবার আর কাউকে মাফ করা হবে না: স্বাস্থ্যমন্ত্রী 

ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন হাসপাতালে এসি বন্ধ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং চরম অব্যবস্থাপনার কারণে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। চিকিৎসাসেবার নামে এমন অবহেলায় নিরপরাধ শিশুদের প্রাণহানির ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আমরা আইনে যতটুকু কঠোর হওয়া সম্ভব, আমরা ততটুকুই যাব। এবার আর কাউকে মাফ করে দেওয়া যায় না।

বৃহস্পতিবার বিকেলে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে তিনি এসব কথা বলেন।

তদন্তে মিলেছে চরম অবহেলার প্রমাণ: 

ঘটনার পরপরই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি বৃহস্পতিবার দুপুর ৩টায় তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বরত নার্স ও স্টাফদের গুরুতর অবহেলার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, যে পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষে ঘটনাটি ঘটেছে সেটি ইতোমধ্যে সিলগালা করা হয়েছে।

তিনি বলেন- তদন্ত প্রতিবেদনে অপরাধ ও অবহেলা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তবে পুরো হাসপাতালে দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতাল বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। আগামী দুই দিন আইনগত বিষয় পর্যালোচনা করে রবিবারের মধ্যে হাসপাতালটির বিষয়ে চূড়ান্ত ও কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 

অক্সিজেন সংকটেই প্রাণ গেল ছয় নবজাতকের: 

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, হাসপাতালের ২ নম্বর পোস্ট-অপারেটিভ কক্ষটি মোটেও চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার উপযোগী ছিল না।

মাত্র ৯০০ বর্গফুটের একটি কক্ষে ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি রোগী, স্বজন এবং হাসপাতালের কর্মীরা অবস্থান করছিলেন। দীর্ঘ সময় ধরে এসি বন্ধ থাকলেও কোনো বিকল্প ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা চালু করা হয়নি।

ফলে কক্ষটির ভেতরে অক্সিজেনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায় এবং কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এমন পরিবেশে সদ্যোজাত শিশুদের শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নবজাতকদের ফুসফুস অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় সামান্য অক্সিজেন সংকটও তাদের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তদন্ত প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকেই মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এটি শুধু অবহেলা নয়, একটি ফৌজদারি অপরাধ: 

ঘটনাটি চিকিৎসাগত অবহেলা নাকি ফৌজদারি অপরাধ—এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন- এটি নিশ্চিতভাবেই একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলা হয়েছে। আবেগের কারণে ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনরা মরদেহ নিয়ে গেছেন, যা অভিযুক্তরা আইনি সুবিধা হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু এটি কোনো গোপন ঘটনা নয়, শতভাগ প্রমাণিত সত্য। আমি বিশ্বাস করি, আদালত এ ঘটনায় দায়ীদের কোনো ছাড় দেবেন না। 

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে- তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অবহেলাজনিত মৃত্যু, দায়িত্বে গাফিলতি এবং জননিরাপত্তা বিপন্ন করার মতো একাধিক ধারায় মামলা পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।

বেসরকারি হাসপাতাল নিয়ন্ত্রণে আসছে নতুন নীতিমালা: 

দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত রোগী ভর্তি, অগ্নিনিরাপত্তাহীনতা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তিনি বলেন- আমরা যেভাবে সচিব, ডিজি এবং প্রতিমন্ত্রীসহ সবাই মিলে আকস্মিক পরিদর্শন কার্যক্রম সাজাচ্ছি এবং যে ধরনের কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি, তাতে ভবিষ্যতে আর কোনো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এভাবে বদ্ধ ঘরে মানুষ বা শিশু রাখার দুঃসাহস দেখাবে না।

তিনি আরও জানান- তদন্ত কমিটি বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরের পূর্বানুমতি, ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাই এবং বাধ্যতামূলক পরিদর্শনের সুপারিশ করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

দেশজুড়ে হাসপাতাল তদারকি জোরদারের ঘোষণা:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে আরও জবাবদিহিমূলক ও নিরাপদ করতে জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে ধারাবাহিক জুম সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

তিনি বলেন- আমাদের নির্দেশনা এবং ব্যবস্থাপনা দিন দিন কঠোর থেকে কঠোরতর হবে। খুব শিগগিরই এর বাস্তব প্রতিফলন মাঠপর্যায়ে দেখা যাবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য সচিব, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. সুমন নাজমুল সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রশ্ন এখন একটাই—ছয় শিশুর মৃত্যুর দায় কে নেবে? 

মগবাজারের এই হৃদয়বিদারক ঘটনা শুধু একটি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার চিত্র নয়, বরং দেশের স্বাস্থ্যখাতের তদারকি, জবাবদিহিতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।

ছয়টি নবজাতকের মৃত্যু কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি ছয়টি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ, ছয়টি মায়ের বুকফাটা কান্না এবং একটি জাতির বিবেককে নাড়া দেওয়া বেদনাদায়ক অধ্যায়।

এখন দেশবাসীর প্রত্যাশা দায়ীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো হাসপাতালের অবহেলায় একটি শিশুরও প্রাণ না ঝরে।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!