প্রকাশিত: জুলাই ২, ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
দেশের সরকারি সেবাকে আরও সহজ, দ্রুত এবং সমন্বিত করতে নতুন একটি ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একজন নাগরিকের জন্মের পরই তার নামে একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় নম্বর তৈরি হবে, যা জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব ধরনের সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে। ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বারবার আলাদা তথ্য জমা দেওয়া কিংবা একাধিক পরিচয়পত্র ব্যবহার করার প্রয়োজন অনেকটাই কমে আসবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো প্রতিটি নাগরিককে একটি মাত্র ডিজিটাল পরিচয়ের আওতায় নিয়ে আসা। সেই পরিচয়ের মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ভ্রমণসংক্রান্ত নথি, ভূমি-সংক্রান্ত তথ্য, যানবাহন নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবার তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকবে। এর ফলে সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়া হবে আরও সহজ, দ্রুত এবং হয়রানিমুক্ত।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো হাসপাতালে শিশু জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রয়োজনীয় তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধন ব্যবস্থায় যুক্ত হবে। এরপর বাবা-মায়ের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে সমন্বয় করে নবজাতকের জন্য একটি স্থায়ী ডিজিটাল পরিচয় নম্বর তৈরি করা হবে। যদি কোনো শিশুর জন্ম হাসপাতালের বাইরে হয়, সেক্ষেত্রেও আলাদা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একই ধরনের পরিচয় তৈরি করা হবে। পরবর্তী সময়ে সেই একটিমাত্র পরিচয় ব্যবহার করেই নাগরিক জীবনের প্রয়োজনীয় সব সরকারি সেবা গ্রহণ করা যাবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এটি এখনো পরিকল্পনা ও প্রাথমিক প্রস্তুতির পর্যায়ে রয়েছে। ধারণাপত্র তৈরি হয়েছে এবং সেটি নিয়ে বিভিন্ন দিক যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রকল্প বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হলে ধাপে ধাপে পুরো কাঠামো গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নেওয়া হবে।
সরকারের পরিকল্পনায় জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ভূমি, যানবাহন নিবন্ধনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডার একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে সংযুক্ত করা হবে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন, সব তথ্য একই ব্যবস্থায় থাকলেও নাগরিকের সম্মতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী শুধুমাত্র নির্দিষ্ট তথ্যই ব্যবহার করা যাবে। এতে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই উদ্যোগের আওতায় প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ডিজিটাল নথি সংরক্ষণ ব্যবস্থা রাখারও পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে পরিচয়সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সরকারি নথি নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করা যাবে। সরকারি বিভিন্ন সেবায় পরিচয় যাচাই কিংবা প্রয়োজনীয় নথি প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও এই ব্যবস্থার ব্যবহার করা হবে। ফলে কাগজভিত্তিক নথির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নত বিশ্বের কয়েকটি দেশে এ ধরনের একক ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা সফলভাবে চালু রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশের বাস্তবতা অনুযায়ী একটি নিরাপদ ও কার্যকর কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তথ্য নিরাপত্তা, নাগরিকের গোপনীয়তা এবং সাইবার সুরক্ষার বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পুরো ব্যবস্থার নকশা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সরকারি সেবা গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা কমবে, একই তথ্য বারবার জমা দেওয়ার প্রয়োজন থাকবে না এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় আরও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং নাগরিকরা দ্রুত সময়ে প্রয়োজনীয় সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে এ ধরনের সমন্বিত পরিচয়ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, তথ্য সুরক্ষায় কার্যকর আইন, দক্ষ জনবল এবং নাগরিকদের মধ্যে ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি। এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে দেশের সরকারি সেবা ব্যবস্থায় নতুন এক যুগের সূচনা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেছেন।



