প্রকাশিত: জুলাই ৫, ২০২৬, ১১:১৭ এএম
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার প্রতি আস্থা প্রকাশ করলেও আরও বেশি জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার সভাপতি তানাকা আকিহিকো। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাপানের প্রতিষ্ঠানগুলো সবসময় স্থিতিশীল পরিবেশ, নীতির ধারাবাহিকতা এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাই বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ আরও শক্তিশালী করতে হলে সুশাসন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তানাকা আকিহিকো বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছানোর সক্ষমতা রাখে। তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আনা, নীতিগত স্থিরতা বজায় রাখা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি উল্লেখ করেন, অনিশ্চয়তা যেকোনো বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে এবং জাপানি বিনিয়োগকারীরা এ ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে আগ্রহী।
বাংলাদেশ সফরকালে তিনি সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে অংশ নেন। এসব বৈঠকে চলমান বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি, বাস্তবায়নের গতি এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন টার্মিনাল, মহানগর রেলপথ এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরসহ জাপানের সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়।
তানাকা আকিহিকো জানান, সাম্প্রতিক প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন কিছুটা ধীর হয়েছে। তবে এ কারণে বাংলাদেশ সরকার ও জাপানের সহযোগিতার সম্পর্কে কোনো মৌলিক মতবিরোধ সৃষ্টি হয়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রয়োজনীয় ক্রয় ও দরপত্র কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন হলে প্রকল্পগুলোর কাজ আবারও স্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে যাবে।
জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো ব্যয়বহুল—এমন সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, কোনো প্রকল্পের মূল্যায়নে শুধু ব্যয়ের অঙ্ক বিবেচনা করলে হবে না। দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা, নির্মাণমান এবং জনগণের উপকারিতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তার মতে, উন্নত মানের অবকাঠামো ভবিষ্যতে অর্থনীতির জন্য বহুগুণ সুফল বয়ে আনে। রাজধানীর মহানগর রেলব্যবস্থাকে তিনি এ ধরনের একটি সফল ও টেকসই বিনিয়োগের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং প্রধান সমুদ্রবন্দরের ওপর দীর্ঘদিনের চাপ অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সংযোগ জোরদার হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
জাপানি উন্নয়ন সহায়তার ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির প্রসঙ্গে তানাকা আকিহিকো বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাস্তবতার কারণে কিছু সমন্বয় করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পরিশোধ করা হলে আগের মতোই রেয়াতি সুবিধা বহাল থাকবে বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে শুধু তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল থাকলে চলবে না। শিল্প ও রপ্তানির বহুমুখীকরণ, কর আদায় বৃদ্ধি, আর্থিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে আরও শক্তিশালী সংযোগ গড়ে তুলতে হবে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্ব ভবিষ্যতেও আরও বিস্তৃত হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে শত শত জাপানি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে। দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের উদ্যোগ বাণিজ্য, শিল্পায়ন এবং নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি মত প্রকাশ করেন।



