প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬, ০৮:০৯ এএম
দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর থেকে আগামী নভেম্বর নাগাদ বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর আশা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের নানা জটিলতা ও সময়সূচি পিছিয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট চালুর প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী সব পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন হলে জাতীয় গ্রিডে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্য দিয়ে দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার আগে কেন্দ্রটিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা ও কারিগরি ধাপ সম্পন্ন করতে হবে। বর্তমানে চাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ভাল্ভের পরীক্ষা ও ত্রুটি সংশোধনের কাজ চলছে। এই কাজ শেষ হওয়ার পর চুল্লিতে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রিত নিউক্লীয় বিভাজন প্রক্রিয়ায় তাপশক্তি উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
চুল্লিতে উৎপন্ন তাপের মাধ্যমে পানি থেকে বাষ্প তৈরি হবে। সেই বাষ্পের চাপ ব্যবহার করে টারবাইন ঘোরানো হবে এবং টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনযন্ত্রের মাধ্যমে উৎপন্ন হবে বিদ্যুৎ। অর্থাৎ চুল্লিতে সরাসরি বিদ্যুৎ তৈরি না হয়ে পারমাণবিক বিভাজন থেকে উৎপন্ন তাপশক্তি কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে বিদ্যুতে রূপান্তরিত হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো শেষ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর্যায়ে যেতে প্রায় দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। এরপর টারবাইনে প্রয়োজনীয় মাত্রায় বাষ্প তৈরি ও পরীক্ষামূলক উৎপাদনের জন্য আরও কয়েক সপ্তাহ প্রয়োজন হবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে মোটামুটি নয় সপ্তাহের মধ্যে প্রথম ইউনিট উৎপাদনে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে শেষ মুহূর্তে কোনো পরীক্ষা বা কারিগরি প্রক্রিয়ায় নতুন সমস্যা দেখা দিলে উৎপাদন শুরুর সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপ নির্ধারিত নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। ফলে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে নিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রূপপুরের উৎপাদিত বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্য নিয়েও আলোচনা চলছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ধারণা, উৎপাদন ব্যয়, পরিচালন ব্যয় ও বীমাসহ অন্যান্য খরচ যুক্ত হলেও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১০ টাকার নিচে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও আলোচনা ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে হবে।
রূপপুর প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানি। রাশিয়া থেকে আনা জ্বালানি ব্যবহারের পর তা কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থাপনা করা হবে, সে বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে নীতিগত সমঝোতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক বিষয়গুলো এখনো পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। ব্যবহৃত জ্বালানি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কেন্দ্রেই নিরাপদে সংরক্ষণ করা সম্ভব হওয়ায় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক চাপ তুলনামূলক কম বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবহৃত জ্বালানির পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পর নিয়মিতভাবে তৈরি হতে পারে এমন অন্যান্য তেজস্ক্রিয় ও ভারী বর্জ্যের নিরাপদ ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব বর্জ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি।
সব মিলিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট চালু হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে। তবে নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন শুরু করার পাশাপাশি নিরাপদ পরিচালনা, দক্ষ জনবল, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এবং তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপদ সংরক্ষণ নিশ্চিত করাই হবে প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।



