প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬, ০২:২৭ পিএম
কারাগারে বন্দিজীবনের একঘেয়েমি ও স্বজনদের কাছ থেকে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা কিছুটা কমাতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশের কারাবন্দিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি ভিডিও যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এরই মধ্যে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে পরীক্ষামূলকভাবে এ সুবিধা চালু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য কারাগারেও একই ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তুতি চলছে।
নতুন এই ব্যবস্থার আওতায় কারাগারে থাকা কয়েদি ও হাজতিরা নির্ধারিত নিয়ম মেনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সপ্তাহে একবার ভিডিও কলে কথা বলতে পারবেন। প্রতিবার সর্বোচ্চ ১০ মিনিট পর্যন্ত যোগাযোগের সুযোগ থাকবে। কারা কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিয়ম, সময়সূচি ও নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করেই এই যোগাযোগ সম্পন্ন হবে।
কারা বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বন্দিদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বজায় রাখা তাদের মানসিক সুস্থতা এবং সংশোধন প্রক্রিয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে অনেক বন্দির মধ্যে হতাশা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ পেলে বন্দিদের মানসিক অবস্থার উন্নতি হওয়ার পাশাপাশি সমাজে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতিও সহজ হতে পারে।
কারা কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভিডিও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বন্দিরা পরিবারের সদস্যদের দেখতে ও তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন। বিশেষ করে যেসব বন্দির পরিবারের সদস্যরা দূরবর্তী এলাকায় বসবাস করেন অথবা নিয়মিত কারাগারে এসে সাক্ষাৎ করতে পারেন না, তাদের জন্য এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে যাতায়াতের সময় ও ব্যয় কমার পাশাপাশি বন্দিদের সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ আরও সহজ হবে।
কারা বিভাগের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা ব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি কারাগারের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলাও নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। নির্ধারিত নিয়মের বাইরে কোনো ধরনের যোগাযোগের সুযোগ থাকবে না।
কারাগারে শুধু ভিডিও যোগাযোগের সুবিধা চালুর উদ্যোগই নয়, বন্দিদের সংশোধন ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হলো সাজা ভোগের সময়টিকে শুধু শাস্তির সময় হিসেবে না দেখে বন্দিদের ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করার সুযোগ হিসেবে কাজে লাগানো। এ উদ্দেশ্যে কারাগারের ভেতরে খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, ধর্মীয় শিক্ষা, মানসিক সহায়তা এবং বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
বন্দিদের কর্মমুখী করে তুলতে উৎপাদনভিত্তিক প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন কারাগারে বন্দিদের হাতে-কলমে কাজ শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে তারা মুক্তির পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গিয়ে নিজেদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারেন। কারাগারের ভেতরে তৈরি বিভিন্ন পণ্য ব্যবহারের পাশাপাশি উৎপাদন কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
কাশিমপুরের একটি কেন্দ্রীয় কারাগারে সাবান তৈরির কার্যক্রম চালু রয়েছে। সেখানে বন্দিদের সম্পৃক্ত করে সাবান উৎপাদন করা হচ্ছে এবং উৎপাদিত সাবান কারাগারে বন্দি ও দায়িত্ব পালনকারী কর্মীদের ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করা হচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রমের মাধ্যমে বন্দিদের শ্রমের মর্যাদা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
বন্দিদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টিও কারা ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বন্দিদের চিকিৎসাসেবা আরও উন্নত করতে কেরানীগঞ্জে কেন্দ্রীয় কারা হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কারা সদর দপ্তরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও রোগ শনাক্তের জন্য পরীক্ষাগার স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
কারাগারের স্বাস্থ্যসেবায় জনবল বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ৫৫ জন প্রশিক্ষিত নার্সের পদায়নের জন্য সুপারিশ পাওয়া গেছে। তাদের নিয়োগ ও পদায়ন সম্পন্ন হলে কারাগারে থাকা বন্দিদের চিকিৎসাসেবা আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নিরাপদ পানির ব্যবস্থার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কাশিমপুরের একটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বিশুদ্ধ পানীয় জল সরবরাহের জন্য পানি পরিশোধন ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বন্দি ও কারাগারে কর্মরত ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কারাগারের খাবারের মান উন্নয়নেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। বিপুলসংখ্যক বন্দির জন্য প্রতিদিন খাবার প্রস্তুত করতে হয়। এ কারণে রান্না ও খাদ্য প্রস্তুত ব্যবস্থাকে আরও সুশৃঙ্খল ও স্বাস্থ্যসম্মত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রুটি তৈরির কাজে আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে অল্প সময়ে বেশি পরিমাণ রুটি প্রস্তুত করা সম্ভব হচ্ছে এবং খাবারের মান ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার সুযোগ বাড়ছে।
বিশেষ দিবসগুলোতে বন্দিদের জন্য খাবারের ব্যবস্থাও করা হয়। এ জন্য নির্দিষ্ট বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কারাগারের ভেতরে বন্দিদের প্রয়োজনীয় পোশাক, জুতা-স্যান্ডেল তৈরি এবং বেকারি কার্যক্রমের মতো বিভিন্ন প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো বন্দিদের মধ্যে কর্মদক্ষতা তৈরি করা এবং মুক্তির পর তাদের স্বাভাবিক জীবনে পুনর্বাসনের পথ সহজ করা।
মানসিক ও সামাজিক বিকাশের বিষয়টিও কারা ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। বন্দিদের খেলাধুলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দিবস উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। কাউন্সেলিং বা মানসিক সহায়তার মতো কার্যক্রমও বন্দিদের আচরণগত পরিবর্তন এবং সামাজিক জীবনে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
কারা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়াতেও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রয়েছে। কারাগারের নিরাপত্তা, বন্দিদের ব্যবস্থাপনা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং মানবিক আচরণসহ বিভিন্ন বিষয়ে দায়িত্বশীলদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কারারক্ষী থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কারাগারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধেও কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কারাগারের ভেতরে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে কঠোর নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। মাদক শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্র সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কারাগারের ভেতরে মাদকবিরোধী তৎপরতা আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কারাগারের পরিবেশ উন্নয়নেও নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। বন্দিদের বসবাসের পরিবেশ আরও স্বাস্থ্যকর করতে সবুজায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি নতুন কারাগারে বিপুলসংখ্যক গাছ লাগানোর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কারাগারের পরিবেশে সবুজের পরিমাণ বাড়লে বন্দিদের মানসিক স্বস্তি এবং সামগ্রিক পরিবেশ উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কারা বিভাগের কর্মীদের কল্যাণের বিষয়টিও পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘদিনের দাবির পর অবসরপ্রাপ্ত কারারক্ষীদের আজীবন রেশন দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে বিশেষ অবদান রাখা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থাও জোরদার করা হচ্ছে। পদক, প্রশংসাপত্র ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির মাধ্যমে ভালো কাজকে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কারা ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের ভিডিও যোগাযোগ চালুর উদ্যোগ এরই একটি অংশ। তবে এই সুবিধা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও গোপনীয়তা বজায় রাখার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। নির্ধারিত সময়ের বাইরে যোগাযোগের সুযোগ না দেওয়া এবং কথোপকথন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষের বিধি অনুসরণ করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্দিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ যত বেশি মানবিক ও নিয়মতান্ত্রিক করা যাবে, সংশোধন ও পুনর্বাসনের লক্ষ্য অর্জন তত সহজ হবে। পরিবার একজন বন্দির জীবনে গুরুত্বপূর্ণ মানসিক সমর্থন হিসেবে কাজ করতে পারে। স্বজনদের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলার সুযোগ বন্দিদের পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে সহায়তা করবে।
কারা কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, ভবিষ্যতে দেশের কারাগারগুলোকে আরও নিরাপদ, মানবিক, আধুনিক ও সংশোধনমুখী প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া। বন্দিদের নিরাপত্তার পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্য, মানসিক বিকাশ, শিক্ষা, দক্ষতা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় ভিডিও কলে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের সুবিধা বন্দিদের জীবনযাত্রায় নতুন একটি মানবিক মাত্রা যোগ করতে পারে।
মুন্সীগঞ্জে পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া এই সুবিধা সফল হলে পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য কারাগারেও তা সম্প্রসারণ করা হবে। এতে কারাগারে থাকা ব্যক্তিরা নির্ধারিত নিয়মে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ পাবেন। কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে থেকেও প্রিয়জনদের দেখতে ও কথা বলতে পারার এই সুযোগ বন্দিদের মানসিক স্বস্তি এবং সংশোধন প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।



