রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বিশ্ব স্বাস্থ্য জেনেভা সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের সামনে ড. এম এ মুহিতের কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন 

শহিদুল ইসলাম খোকন

প্রকাশিত: মে ২৩, ২০২৬, ১০:৩৯ এএম

বিশ্ব স্বাস্থ্য জেনেভা সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের সামনে ড. এম এ মুহিতের কর্মপরিকল্পনা উপস্থাপন 

ফাইল ছবি

বিশ্বব্যাপী দ্রুত বাড়তে থাকা লিভার রোগ, বিশেষ করে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থান, বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনা ও জনস্বাস্থ্যভিত্তিক উদ্যোগ বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।

সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চলমান ৭৯তম ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলি-এর সাইডলাইনে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী সভায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, লিভার রোগ এখন আর কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, কর্মক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক নীরব বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

শুক্রবার (২২ মে) অনুষ্ঠিত এই বৈশ্বিক সংলাপের মূল প্রতিপাদ্য ছিল বিশ্বজুড়ে স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ বা ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর স্বাস্থ্য অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা গ্লোবাল লিভার ইনস্টিটিউট সম্মেলনের এই বিশেষ অধিবেশনের আয়োজন করে।

নীরব ঘাতককে আর আড়ালে রাখা যাবে না: 

সম্মেলনে প্রধান প্যানেলিস্টদের অন্যতম হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে ড. এম এ মুহিত বলেন-
অসংক্রামক রোগের তালিকায় লিভারের রোগগুলো দীর্ঘদিন আড়ালে থেকে গেছে। অথচ বিশ্বজুড়ে লাখো মানুষের অকাল মৃত্যুর জন্য দায়ী এই নীরব ঘাতক। এখনই সময় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র থেকেই আধুনিক রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে কমিউনিটি ক্লিনিকভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ করেছে। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ফ্যাটি লিভারসহ অন্যান্য লিভার রোগ শনাক্তে ডিজিটাল স্ক্রিনিং, জীবনাচরণভিত্তিক সচেতনতা কর্মসূচি এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, শহর ও গ্রামে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম কমে যাওয়া, স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণের কারণে ফ্যাটি লিভার রোগ দ্রুত বাড়ছে। সময়মতো শনাক্ত না হলে এটি লিভার সিরোসিস, ক্যানসার কিংবা অঙ্গ বিকল হওয়ার মতো জটিল অবস্থার জন্ম দিতে পারে।

বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ফ্যাটি লিভার

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে অন্তত একজন কোনো না কোনো মাত্রায় ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নগরায়ন, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এবং ডায়াবেটিস বৃদ্ধির কারণে এ ঝুঁকি আরও দ্রুত বাড়ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্যাটি লিভারের বড় সমস্যা হলো—প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটির তেমন কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ থাকে না। ফলে অধিকাংশ মানুষ দীর্ঘদিন না জেনেই এই রোগ বহন করেন। পরে জটিলতা তৈরি হলে চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়ে যায় বহুগুণ।

এ বাস্তবতায় সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা একমত হন যে, সঠিক সময়ে রোগ শনাক্তকরণ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যনীতি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন অত্যন্ত জরুরি।

যৌথ অংশীদারিত্বই হতে পারে সমাধান: 

সভায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে “সমন্বিত যৌথ অংশীদারিত্ব” গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। বক্তারা বলেন, শুধু চিকিৎসা নয়—স্বাস্থ্য শিক্ষা, প্রযুক্তি বিনিময়, গবেষণা, পুষ্টিনীতি ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

ড. এম এ মুহিত বলেন-
স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য কমাতে হলে উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিকে উন্নয়নশীল দেশের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বিনিয়োগই ভবিষ্যতের সবচেয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত।

বৈশ্বিক সংলাপে বিশ্বনেতাদের অংশগ্রহণ: 

উচ্চপর্যায়ের এই বৈশ্বিক সংলাপে বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। প্যানেলে ড. মুহিতের পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সৈয়দ মুস্তফা কামাল, নাইজেরিয়ার স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী অধ্যাপক মুহাম্মদ আলী পাটে, রাশিয়ার স্বাস্থ্য উপমন্ত্রী ড. ওলেগ সালাগে, কুয়েতের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি শেখ ড. সালমান খলিফা আবদুল্লাহ আল-সাবাহ এবং কাতারের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ বিভাগের প্রধান শেখ ড. মোহাম্মদ বিন হামাদ আল-থানি।

এছাড়া চীনের ন্যাশনাল হেলথ কমিশনের প্রতিনিধি লেই হাইচাও নিজ দেশের কৌশলগত অবস্থান তুলে ধরেন।

সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইউরোপীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক ড. হ্যান্স হেনরি পি. ক্লুগে, মিসরের স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. খালেদ আবদেল গাফফার এবং গ্লোবাল লিভার ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী ল্যারি আর. হোল্ডেন।

বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ: 

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস বৃদ্ধির কারণে ফ্যাটি লিভার এখন নীরব মহামারিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ এটিকে গুরুত্ব না দিলেও পরবর্তীতে এটি প্রাণঘাতী জটিলতায় রূপ নেয়।

এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ শুধু কূটনৈতিক অর্জন নয়; বরং দেশের স্বাস্থ্যনীতি, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনের এই মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে ড. এম এ মুহিত কার্যত একটি বার্তাই দিয়েছেন—
স্বাস্থ্যসেবা শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন, ভবিষ্যৎ ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!