প্রকাশিত: মে ২০, ২০২৬, ০৩:০৫ পিএম
কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারায় অভিযান চলাকালে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার নিহত হওয়ার বহুল আলোচিত মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে হত্যাকাণ্ডে জড়িত চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে আরও কয়েকজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা এবং কয়েকজনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আদালতের এ রায়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বুধবার দুপুরে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। আদালত কক্ষে রায় ঘোষণার সময় আইনজীবী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আদালতের রায়ে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। একইসঙ্গে পাঁচজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া চারজনকে দশ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অপরদিকে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় পাঁচজনকে খালাস প্রদান করা হয়েছে। আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ, জবানবন্দি ও বিভিন্ন উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
মামলার শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ একে অত্যন্ত নৃশংস ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হিসেবে তুলে ধরে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সেনা কর্মকর্তাকে প্রাণ হারাতে হয়েছে, যা শুধু একটি হত্যার ঘটনা নয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। বিচারিক প্রক্রিয়ায় মোট ৫২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। সাক্ষীরা আদালতে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন, যা মামলার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় ২০২৪ সালে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা ইউনিয়নের পূর্ব মাইজপাড়া এলাকায়। ওই এলাকায় ডাকাতির খবর পেয়ে যৌথ বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে। গভীর রাতে সন্দেহভাজন একটি বাড়ি ঘিরে ফেলে অভিযানকারী দল। অভিযান চলাকালে লেফটেন্যান্ট তানজিম সারোয়ার সাহসিকতার সঙ্গে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের থামার নির্দেশ দেন। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়।
অভিযানের সময় দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তানজিম সারোয়ারের ওপর হামলা চালায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি ঘটলে উন্নত চিকিৎসার জন্য সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। তবে চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুতে সেনাবাহিনীসহ পুরো দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে।
এই হত্যাকাণ্ডের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যাপক অভিযান শুরু করে এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে তদন্ত জোরদার করা হয়। তদন্ত শেষে মোট ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্যগ্রহণের পর অবশেষে আদালত চূড়ান্ত রায় দেন।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা জানিয়েছেন, মামলার প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে। আদালত সাক্ষ্য, আলামত ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা বিচার করে রায় প্রদান করেছেন। তারা মনে করছেন, এই রায় অপরাধীদের জন্য কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।
এদিকে রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। নিহত সেনা কর্মকর্তা তানজিম সারোয়ারের পরিবারের সদস্যরাও এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। তাদের প্রত্যাশা ছিল দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় দ্রুত বিচার ও দৃশ্যমান শাস্তি অপরাধ দমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একইসঙ্গে এমন রায় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় জনগণের আস্থাও আরও দৃঢ় করবে।



