রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

গুমের তদন্তে আসছে আন্তঃবাহিনী ব্যবস্থা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬, ১২:২৭ পিএম

গুমের তদন্তে আসছে আন্তঃবাহিনী ব্যবস্থা

ছবিঃ সংগৃহীত

গুমের অভিযোগ উঠলে অভিযুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজে সেই ঘটনার তদন্ত করতে পারবে না। তদন্তে নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযুক্ত বাহিনীর পরিবর্তে অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী অথবা বিশেষ আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের ওপর দায়িত্ব দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬-এ। জাতীয় সংসদে আইনটি পাস হওয়ার পর গুমের অভিযোগের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় নতুন কাঠামো তৈরি হলো।

নতুন আইনে গুমকে স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সরকারি কর্মচারীর পরিচয়ে বেআইনিভাবে আটক, অপহরণ বা স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পর তার অবস্থান অস্বীকার করা, গোপন রাখা কিংবা তাকে আইনের সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হলে সেটিকে গুম হিসেবে গণ্য করা হবে।

আইনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো তদন্তের ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাত এড়ানোর ব্যবস্থা। কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা ওই বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী নিজে তদন্ত করতে পারবে না। অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা বিশেষ আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবে। ফলে একই প্রতিষ্ঠানের সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তদন্ত করার সুযোগ থাকবে না।

আইনে অপরাধের দায় শুধু সরাসরি জড়িত ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কমান্ডার বা দলনেতা অধস্তন সদস্যদের গুমের মতো অপরাধ করার নির্দেশ দিলে, প্ররোচনা দিলে কিংবা অপরাধ প্রতিরোধে দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় থাকলে তাকেও মূল অপরাধীর মতো শাস্তির আওতায় আনা যাবে। একই সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ পালন করা হয়েছিল বা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কাজটি করা হয়েছে—এ ধরনের অজুহাতকে দায় এড়ানোর গ্রহণযোগ্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।

সাধারণ গুমের অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বনিম্ন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। গুমের ঘটনায় ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে অথবা পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও তার জীবিত কিংবা মৃত অবস্থার কোনো সন্ধান না পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড হতে পারে।

গুমের প্রমাণ নষ্ট করা, তথ্য গোপন করা কিংবা গোপন আটককেন্দ্র তৈরি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। এসব অপরাধে সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

আইনে গুমের ঘটনা যদি ব্যাপক বা পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত হয়, তাহলে সেটিকে শুধু সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখা হবে না। এমন ঘটনা মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারযোগ্য হবে। সাধারণ আদালতে কোনো মামলা চলার সময় যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে ঘটনাটি ব্যাপক বা পদ্ধতিগতভাবে সংঘটিত হয়েছে, তাহলে সেটি ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সুযোগ থাকবে। তদন্তের পর্যায়েও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।

নতুন আইনে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। তদন্ত শেষ করার জন্য ৯০ দিনের সময় রাখা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর দায়রা আদালতে বিচার শেষ করার জন্যও সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবস নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে আরও ৩০ দিন সময় বাড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।

গুমের শিকার ব্যক্তি ও তার পরিবারের অধিকার রক্ষায়ও আইনে বেশ কিছু বিধান রাখা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকলে তার পরিবারের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় দায় পরিশোধের জন্য আদালতের মাধ্যমে গুম সনদ নেওয়ার সুযোগ থাকবে। স্বামী, স্ত্রী বা নির্ভরশীলরা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ওই ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। গুমের পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলে আইনগত উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের বিষয়েও আদালত প্রয়োজনীয় ঘোষণা দিতে পারবে।

ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি জব্দ ও নিলামের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের অর্থ সংগ্রহ করা যাবে। ওই ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণের দায়িত্ব নিতে হবে। পাশাপাশি গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য পুনর্বাসন এবং আইনি সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিধান রয়েছে।

তদন্ত ও বিচারে প্রযুক্তিনির্ভর প্রমাণ ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে। ভিডিও, ফোনালাপের রেকর্ডসহ বিভিন্ন ধরনের বৈদ্যুতিক তথ্য-প্রমাণ আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা যাবে। একই সঙ্গে সাক্ষী ও তথ্য প্রদানকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

গুমসংক্রান্ত ঘটনা, সংশ্লিষ্ট বাহিনীর পরিচয়, ইউনিটের তথ্য এবং তদন্তের অগ্রগতি সংরক্ষণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার তৈরির বিধান রয়েছে। এর মাধ্যমে গুমের অভিযোগ ও তদন্তের তথ্য দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গুমের অভিযোগ তদন্তে অভিযুক্ত বাহিনীকে বাদ দেওয়ার বিধানটি স্বার্থের সংঘাত কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে একই বাহিনীর মাধ্যমে তদন্ত পরিচালিত হলে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে, তদন্তের দায়িত্ব অন্য বাহিনী বা বিশেষ তদন্ত দলের কাছে দেওয়ার মাধ্যমে অভিযোগ যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তুলনামূলক নিরপেক্ষ পরিবেশ তৈরি করার সুযোগ থাকবে।

নতুন আইন কার্যকর হওয়ার ফলে গুমের অভিযোগে দায় নির্ধারণ, তদন্ত, বিচার এবং ভুক্তভোগী পরিবারের অধিকার সুরক্ষার জন্য একটি নির্দিষ্ট আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাপক বা পদ্ধতিগত গুমের ঘটনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিচারের আওতায় আনার বিধান বিষয়টিকে আরও গুরুতর আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছে।

সব মিলিয়ে গুমের অভিযোগে অভিযুক্ত বাহিনীকে তদন্তের বাইরে রাখা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায় নির্ধারণ, কঠোর শাস্তি, ক্ষতিপূরণ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের অধিকার সুরক্ষার বিধান—নতুন আইনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামনে এসেছে। এখন এই বিধানগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়, সেটিই হবে আইনের কার্যকারিতা নির্ধারণের প্রধান বিষয়।

মাতৃভূমির খবর

Advertisement
Advertisement
Link copied!